দেশে কিডনি রোগীর চিকিত্সা সুবিধার পাশাপাশি ডায়ালিসিস সেন্টারেরও স্বল্পতা আছে। পুরাতন আটটি মেডিক্যাল কলেজের কয়েকটিতেই ডায়ালিসিস সেন্টার নাই। অনেক বড় হাসপাতালেও কিডনির জন্য পৃথক ইউনিট নাই। আর জেলা পর্যায়ে ইহার কোনো চিকিত্সাই নাই। অথচ দেশে দুই কোটিরও বেশি মানুষ কিডনি রোগে আক্রান্ত। অন্যদিকে, কিডনি বিশেষজ্ঞ আছেন মাত্র ৮০ হইতে ৯০ জন। আর বলাই বাহুল্য, কিডনি রোগের চিকিত্সাও অত্যন্ত ব্যয়বহুল। ফলে, বত্সরে প্রায় ৪০ হাজার রোগী কিডনি বিকল হইয়া মারা যাইতেছেন, বস্তুত ডায়ালিসিস না করিতে পারিয়া। উল্লেখ্য, ডায়ালিসিস রক্ত পরিষ্কার করিবার একটি বিকল্প পদ্ধতি। কিডনি রোগীর রক্ত পরিশোধনের জন্য ডায়ালিসিস করিতে হয়। রক্তে বর্জ্য পদার্থ বাড়িয়া গেলে রোগী ধীরে ধীরে অসুস্থ হইয়া এক সময় মৃত্যুবরণ করেন। তাই কিডনির অসুখ হইলে ডায়ালিসিস অপরিহার্য হইয়া পড়ে।
অথচ, দেশের মোট ৯৬টি ডায়ালিসিস সেন্টারে মাত্র ১৮ হাজার রোগী প্রতি সপ্তাহে এই সেবা পান। অর্থাত্ কিডনি রোগীদের মাত্র ১৫ ভাগ ডায়ালিসিস করিবার সুযোগ পান। তাহাও বিত্তবান ১৫ ভাগ। আক্রান্ত অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী অর্থাভাবে ডায়ালিসিস করাইতে পারেন না। বেসরকারি ক্লিনিকে প্রতিবার ডায়ালিসিসের জন্য খরচ হয় অন্তত তিন হাজার টাকা। এই হিসাবে মাসে খরচ ৩৬ হাজার টাকা। সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষও কয়েক বত্সর এই সেবা লইতে গেলে নিঃস্ব হইয়া পড়িবেন। বস্তুত, শতকরা ৫ ভাগ মানুষেরও দীর্ঘমেয়াদি ব্যয়বহুল এই চিকিত্সা চালাইবার সামর্থ্য নাই। তাহাদের কথা মাথায় রাখিয়াই স্বল্পমূল্যে ডায়ালিসিস সুবিধা প্রদানে গত বত্সরের ৩০ নভেম্বর হইতে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ডিজিজেস অ্যান্ড ইউরোলজিতে (নিকডু) পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় যে ১৪টি মেশিনের কার্যক্রম শুরু হইয়াছে, তাহাতে মাত্র ১১৫ রোগী ডায়ালিসিসের সুযোগ পাচ্ছেন। মাত্র ৪০০ টাকায় ডায়ালিসিস সুবিধার কারণে রোগীর উপচেপড়া ভিড় হাসপাতালটিতে। ফলে আক্রান্তরা মন্ত্রী, এমপিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রভাবশালীদের সুপারিশ নিয়া ডায়ালিসিসের সিরিয়াল পাইতে আবেদন করিতেছেন। অবকাঠামোর তুলনায় রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সুচিকিত্সাও নিশ্চিত করিতে পারিতেছে না প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্বজুড়িয়াই মানুষের কিডনি অকেজো হইবার ঘটনা বাড়িয়া চলিয়াছে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নহে। গত এক বত্সরে নিকডুতে কিডনি রোগী বৃদ্ধির হার ছিল শতকরা ১৭ ভাগ। এই রোগের সবচাইতে বড় সমস্যা হইলো, প্রথমদিকে এর কোনো উপসর্গই বুঝা যায় না। কিন্তু যখন উপসর্গ ধরা পড়ে, ততোক্ষণে কিডনির প্রায় ৭৫ ভাগই বিকল হইয়া পড়ে। অথচ প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করিতে পারিলে ৬০ ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব। কাহারো কিডনি রোগাক্রান্ত হইয়াছে কিনা তাহা জানিতে বত্সরে অন্তত একবার রক্তের ক্রিয়েটিনিন ও প্রস্রাব পরীক্ষা করা প্রয়োজন। ভালোভাবে জানিয়া প্রতিরোধে সচেতন হইলে এই ঘাতকব্যাধি অনেকাংশেই রোধ করা সম্ভব। ডাক্তারেরা ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যতীতও প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা, অতিরিক্ত লবণ পরিত্যাগ, ফাস্টফুড, চর্বি জাতীয় ও ভেজাল খাবারসহ ধূমপান বর্জনের পরামর্শ দেন। সেইসঙ্গে, আমরা বলিব, স্বল্প আয়ের রোগীদের কথা বিবেচনা করিয়া ডায়ালিসিস খরচ কমাইতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণও আশু প্রয়োজন হইয়া পড়িয়াছে।
