দক্ষিণাঞ্চলে জ্বালানি কাঠের সংকট, এলপি গ্যাসের চড়া দাম

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৭, ০১:৩০

দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে জ্বালানি কাঠের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সংকটের কারণে গত এক মাসে দাম বেড়েছে মণ প্রতি ৫০টাকা। জ্বালানি কাঠের দাম বৃদ্ধির কারণে এক শ্রেণির লোক উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীসহ বনবিভাগের বিভিন্ন বনাঞ্চল থেকে কাঠ চুরির কাজে নেমে পড়েছে।  এলপি গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাওয়ায় মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। ফলে তারাও চড়া দামে এ চোরাই কাঠ ক্রয় করে রান্নাবান্নার কাজ করছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের কোথাও সরকারিভাবে গ্যাস সরবরাহের ব্যবস্থা নেই। মানুষ এখানে জ্বালানি কাঠের উপর নির্ভরশীল। শহর অঞ্চলে সচ্ছল পরিবার বেসরকারি কোম্পানির সিলিন্ডারে এলপি গ্যাস ক্রয় করে রান্নার কাজ করেন। গত দুই মাসে এ গ্যাসের দাম বেড়েছে ১৮০টাকা থেকে দু’শ টাকা পর্যন্ত। পরিবেশ অধিদপ্তরের মতে, দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণাঞ্চলের ৮০ ভাগ পরিবারই বাসা-বাড়িতে জ্বালানি হিসেবে কাঠ লাকড়ি ব্যবহার করে। নামি-দামি রেস্টুরেন্ট, খাবার হোটেল, বেকারি, ফুড প্রোডাক্ট              কোম্পানি ও কমিউনিটি সেন্টারসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের খাবার তৈরিতে জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার হয়। সবচেয়ে বেশি জ্বালানি কাঠের ব্যবহার হয়ে থাকে ইটের ভাটাগুলোতে। সব মিলিয়ে যে পরিমাণ কাঠ পোড়ানো হচ্ছে সে পরিমাণের কাঠ উত্পাদন ও সরবারহ না থাকায়  দিনে দিনে জ্বালানি কাঠ সংকট প্রকট আকার ধারণ করছে। নদীভাঙনে বণাঞ্চল উজাড় হওয়ার পাশাপাশি কাঠের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় ক্রমশ সংকট ঘনীভূত হচ্ছে।

নগরীর চানমারী, হাটখোলা, পলাশপুর, কাউনিয়া বিসিক এলাকার কাঠ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, গত এক মাসে জ্বালানি কাঠের দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। নগরীর পলাশপুর সংলগ্ন এলাকার কাঠ ব্যবসায়ী খোকন বেপারী জানান, এখন তারা অগ্রিম টাকা দিয়েও কাঠ কিনতে পারছেন না। উপকূল কিংবা নগরীর আশপাশের যেসব এলাকা থেকে দৈনিক হাজার হাজার মণ কাঠ আসতো তা এখন সীমিত আকারে আসছে। বেশি দামে ক্রয়ের কারণেই তারা চড়া মূল্যে কাঠ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন বলে ব্যবসায়ীরা জানান। গত মাসেও তারা প্রতিমণ রেইন্ট্রি বিক্রি করেছেন ১৫০ টাকায়, এখন তাদের বিক্রি করতে হচ্ছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। চাম্বুল কাঠ প্রতি মণ বিক্রি হতো ১৭০ টাকায়, এখন বিক্রি  হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০টাকায়। প্রতি বছরই বর্ষার পূর্বে কাঠ ক্রয় করে মজুদ করা হয়। এ বছর এত দাম বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে ব্যবসায়ীরা জানান, দুই মাসে পাইকারি বাজারেই গ্যাসের দাম বেড়েছে প্রায় দু’শ টাকা। এর সাথে পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে।

যারা কাঠের পরিবর্তে গ্যাসে রান্না করেন তাদেরও স্বস্তি নেই। জানুয়ারি মাসে যে সিলিন্ডারের দাম ছিল ৮শ থেকে ৮২০ টাকা তা বর্তমানে ৯৮০ থেকে হাজার টাকায় পৌঁছেছে। পাড়া-মহল্লার বাসা-বাড়িতে তা বিক্রি হচ্ছে হাজার টাকায়। এক সিলিন্ডার গ্যাসে ছোট পরিবারের কম রান্নাবান্না করা হলেও এক মাসের বেশি পার করা যায় না। বড় পরিবারে মাসে সিলিন্ডার দরকার হয় দু’টি। নগরীর বটতলাস্থ শরীফ এন্টারপ্রাইজের স্বত্ত্বাধিকারী নূর-উল-আলম শাহীন জানান,  বসুন্ধরা এলপি গ্যাস, ক্লিনহিট ও টোটাল গ্যাসের মূল্য গত দুই মাসে সিলিন্ডারপ্রতি ২শ’ টাকা বেড়েছে।

লাফিয়ে লাফিয়ে গ্যাসের দাম বাড়ার কারণে অনেকেই নতুন করে জ্বালানি কাঠের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলেও জ্বালানি কাঠের দাম বাড়ছে। আর কাঠের এ চড়া মূল্য দেখে এক শ্রেণির লোক নতুন পেশা হিসাবে কাঠ চুরি ও পাচারকে বেছে নিয়েছে। তারা রাতের আঁধারে বন বিভাগের প্রহরীদের ম্যানেজ করে কাঠ নৌকা ও ট্রলার ভর্তি করে মোকামে নিয়ে আসছে। ইটভাটার পাশাপাশি এ সব কাঠ নগরীর মোকামগুলোতে বিক্রি হচ্ছে। উজাড় হতে চলছে উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনীসহ বনাঞ্চল। এ ব্যাপারে পরিবেশ অধিদপ্তরের আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রাশেদ আহমেদ  জানান, তারা মাঝে-মধ্যে জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট নিয়ে ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করেন। তবে যেভাবে কাঠের দাম বাড়ছে তাতে বন রক্ষায় স্থানীয় প্রশাসনকে আরো সতর্ক হতে হবে।

ইত্তেফাক/নূহু