আমাদের দৈনন্দিন জীবনে পলিথিন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও উপকারের দিকটা বিবেচনা করে পলিথিন পরিত্যাগ আমাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠছে। বলা যায়, এটি আমাদের জীবনযাত্রায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে। একেবারে শপিং ব্যাগ থেকে শুরু করে খাদ্যদ্রব্য কিংবা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংরক্ষণ করতেও পলিথিনের ব্যাপক ব্যবহার হচ্ছে। সে সুযোগটিও নিচ্ছেন প্রস্তুতকারীরা। পলিব্যাগ নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারা ব্যাগের হাতল না বানিয়ে ঠোঙার রূপ দিয়ে তা বাজারজাত করছেন। এর ব্যবহারও হচ্ছে ব্যাপক। হাতলবিহীন ঠোঙা ব্যবহারে কিছুটা বিপত্তি থাকলেও ব্যবহারকারীরা মেনে নিচ্ছেন তা খুব সহজে। আর কিছু না হোক উপকারে তো আসছেই! এটি হচ্ছে আমাদের এক ধরনের হাস্যকর বিলাসিতা। কারণ পলিথিন ব্যবহারের উপকারিতা জানলেও আমরা এর ক্ষতিকর দিকটা সম্পর্কে এখনো অজ্ঞ রয়ে গেছি। এতে যেমন ব্যবহার হচ্ছে যথেচ্ছভাবে, তেমনি উত্পাদনও হচ্ছে মর্জিমাফিক। পরিবেশবিদরা জানিয়েছেন যে,‘পলিথিন দূষণ স্থল মাইনের চেয়েও মারাত্মক ভয়ঙ্কর’।
একটু সচেতন হলেই আমরা পলিথিনের বিষাক্ত ছোবলের হিসাবটা বের করে নিতে পারি খুব সহজেই। তার আগে জেনে নিতে হবে পলিথিনের গলনাঙ্ক তাপের হিসাবের তথ্য। সাধারণত আমাদের দেশে পলিথিন ১২০-১৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপ মাত্রায় পোড়ানো হয়। এতে কিন্তু পলিথিন সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয় না। এটিকে বিনষ্ট করতে হলে সাত হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরের তাপমাত্রায় পোড়াতে হয়,নয়তো ডাইঅক্সিন জাতীয় এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টি হয়। যে গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ফুসফুস এবং ত্বকে ক্যান্সারের সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া পলিথিন পোড়ানোর সময় হাইড্রোজেন সায়ানাইড নামক এক ধরনের বিষাক্ত গ্যাসের সৃষ্টির কারণে দহনকারী ব্যক্তি মৃত্যুর দ্বারে পৌঁছে যান। এ ধরনের কিছু ঘটনা ঘটেছেও আমাদের দেশে ১৯৯৪-৯৫ সালের মধ্যে। তখন প্রায় ১৫০ জন মহিলা ও ৩০০ শিশু শ্রমিক হাইড্রোজেন সায়ানাইডের শিকার হয়েছেন।
জানা গেছে, আমাদের দেশে প্রায় ৭৫ ভাগ মানুষ নানা কাজে পলিথিন ব্যবহার করে থাকেন। এ ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা শুধু শপিংয়ে নয়, প্রাত্যহিক কাজে এর ব্যাপক ব্যবহার হয়ে থাকে। যে কাজটি বেশি হয়, সেটি হচ্ছে খাদ্যদ্রব্য পলিথিন দিয়ে মুড়িয়ে ফ্রিজআপ করা। অথচ আমাদের অনেকেরই জানা নেই, পলিথিন মোড়ানো খাদ্যদ্রব্য সংরক্ষণ করলে এক ধরনের অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার কবলে পড়তে হয় খাদ্যদ্রব্যকে। এতে করে আমরা আক্রান্ত হতে পারি মারাত্মক চর্মরোগসহ ক্যান্সারের মতো দুরারোগ্য ব্যাধিতে। দেখা যায়, অনেকে আবার খাবারকে নিরাপদে ঢেকে রাখতে রঙিন পলিথিন ব্যবহার করেন—যা আরো মারাত্মক। পলিথিনের রাসায়নিক উপাদানের সঙ্গে রঙের রাসায়নিক উপাদান মিশে খাদ্যে বিষক্রিয়া সৃষ্টির কারণে আমরা নানা ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ি। পলিথিন ব্যবহারে শুধু খাদ্যে বিষক্রিয়াই ঘটে না, ঘটে ড্রেনেজ ব্যবস্থারও বিপত্তি; কারণ পলিথিন শত বছর ধরেও সক্রিয় থাকতে সক্ষম।
উন্নত দেশগুলো বিষয়টি মাথায় রেখে পচনশীল পলিথিন তৈরি করছে। তারা পচনশীল পলিথিন বা প্লাস্টিক তৈরিতে ভুট্টা বা চালের স্টার্চ মিশিয়ে দিচ্ছে। এতে পলিথিন মাটিচাপা পড়লে খুব দ্রুত ব্যাকটেরিয়ার কবলে পড়ে অণুগঠন হারিয়ে ফেলে। তার সঙ্গে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি দ্বারা নিঃশেষ হয়ে যায়। অবশ্য দ্রুত বিনষ্ট হওয়াটা নির্ভর করে মিশ্রিত স্টার্চের পরিমাণ এবং মাটির গঠন ও তাপ আর্দ্রতার পরিমাণের ওপর। আমাদের দেশে যেহেতু ওই ধরনের প্রযুক্তি নেই, তাই বাজারে সয়লাব হওয়া পলিথিন সম্পূর্ণরূপে ব্যবহার অনুচিত। পাশাপাশি উচিত কাজটি হচ্ছে পলিথিন উত্পাদনের ক্ষেত্রে আরো কঠোর ভূমিকা নেওয়া—যাতে করে হাতলছাড়া শপিং ব্যাগও যেন বাজারে প্রবেশ করতে না পারে। এ কাজটি শুধু আইন প্রয়োগ করেই সমাধান করা যাবে না। এটি সমূলে নির্মূল করতে হলে ব্যাপক জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে এবং এ বিষয়ে প্রচার মাধ্যমগুলোও অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। বিষয়টা যত বেশি জানাজানি হবে, ততই মানুষ সচেতন হয়ে উঠবে। এক সময় নিজ থেকেই পলিথিন বর্জনে উদ্বুদ্ধ হবে। ব্যাপক প্রচারের ফলে যেমন আর্সেনিকযুক্ত জল পরিহার শিখেছে মানুষ। এ ক্ষেত্রেও সফলতা আসবে অবশ্যই।
n লেখক : বন্যপ্রাণী বিশারদ
