নগরে উন্মুক্ত মাঠের সংস্কার ও সুরক্ষা

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৪

আধুনিক নগর জীবনে পার্ক ও খেলার মাঠকে বলা হয় ‘নগরের ফুসফুস’। কিন্তু আমাদের রাজধানী ঢাকার এই ফুসফুস খুবই দুর্বল। গত দুই দশকে ঢাকার দুই-তৃতীয়াংশ মাঠ সম্পূর্ণ হারাইয়া গিয়াছে। অনেক মাঠ আজ বেদখলে। যেইগুলি আছে সেইগুলির মধ্যে অনেক মাঠ আবার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বা খেলার উপযোগী নহে। একসময় যখন ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা ছিল ১০ লক্ষ, তখন খেলার মাঠের সংখ্যা ছিল অন্তত ৫০টি। এখন দেড় কোটিরও বেশি মানুষের এই মেগাসিটিতে পার্ক ও খেলার মাঠ যে হারে বৃদ্ধি পাওয়া দরকার, তাহা বৃদ্ধি পায় নাই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিন দিন তাহা সংকুচিত হইয়া আসিতেছে। এই পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। রাজধানীর খেলার মাঠ নিয়া সমপ্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ‘ঢাকা শহরে বিদ্যমান খেলার মাঠের ঘাটতি ও চাহিদা পর্যালোচনা’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করিয়াছে। তাহাতে বলা হইয়াছে যে, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৯২টি ওয়ার্ডে (নূতন যুক্ত হওয়া ওয়ার্ডগুলি ব্যতীত) সরকারি-বেসরকারি মোট ২৩৫টি খেলার মাঠ রহিয়াছে। তন্মধ্যে সর্বসাধারণ ব্যবহার করিতে পারে মাত্র ৪২টি। ১৪১টি মাঠ আছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিকানায়, কলোনীর মাঠ আছে ২৪টি ও ঈদগাহ মাঠ আছে ১২টি। আর ১৬টি সরকারি মাঠ বিভিন্নভাবে বেদখল হইয়া আছে।

শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। খেলাধুলা করিলে পেশীর নড়াচড়া ও রক্ত সঞ্চালন বাড়ে। ইহা মস্তিষ্ক ও মনকে সতেজ রাখিতে এবং সঠিক সামাজিকীকরণে সহায়তা করে। পক্ষান্তরে আমরা লক্ষ্য করিতেছি, রাজধানীর অধিকাংশ শিশু চার দেওয়ালের ফ্ল্যাট বা অ্যাপার্টমেন্টে একপ্রকার বন্দি জীবনযাপন করিতেছে। মাঠের অভাবে বা স্কুলে পড়াশুনার চাপে তাহারা যেইটুকু সময় পাইতেছে, সেই সময় মোবাইল বা ভিডিও গেমস নিয়া ব্যস্ত থাকিতেছে। ইহাতে তাহাদের শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হইতেছে। স্থূলতা, একাকিত্ব, হতাশাসহ নানা অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হইতেছে তাহারা। এমনকি তাহাদের মানসিক শক্তি কম হওয়ায় তাহারা ঠুনকো কারণে বা মান-অভিমানে আত্মহত্যাও করিতেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতিটি মানুষের জন্য ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা তথা খেলার মাঠ, পার্ক ইত্যাদি থাকা প্রয়োজন। কিন্তু ঢাকা শহরে জনপ্রতি খোলা জায়গার পরিমাণ এক বর্গমিটারেরও কম।

নগরবাসীর বিনোদন ও ভালোভাবে শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার জন্য পার্ক ও খেলার মাঠের সংস্কার ও উন্নয়ন জরুরি। এইসব উন্মুক্ত স্থানে খেলাধুলার পাশাপাশি ব্যায়ামাগার, ইনডোর গেমসের সুবিধা, নামাজের স্থান, ফোয়ারা, পাবলিক টয়লেট, উন্মুক্ত মঞ্চ, খাবারের দোকান প্রভৃতি থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন নারীদের জন্য পৃথক বসিবার স্থান, সাইকেল ট্র্যাক, ওয়াকওয়ে ইত্যাদিও। সেইখানে বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীসহ সর্বসাধারণের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করিতে হইবে। বিশেষ করিয়া প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি উন্নতমানের খেলার মাঠ এবং সুসজ্জিত ও সুশোভিত পার্ক থাকা দরকার। একইসঙ্গে নূতন মাঠ তৈরিতে প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণসহ যেইসব এলাকায় নূতন করিয়া নগরায়ন প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হইতেছে, সেইখানে পরিকল্পিতভাবে মাঠ ও পার্কের ব্যবস্থা রাখা একান্ত আবশ্যক।