চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও আমাদের করণীয়

আপডেট : ০১ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৬

আঠারো শতকের শেষার্ধে শিল্পোত্পাদনের ক্ষেত্রে ইংল্যান্ডে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা ঘটে তাকেই সাধারণভাবে শিল্পবিপ্লব বলা হয়। শিল্পবিপ্লবের ফলে ইংল্যান্ড বিশ্বের প্রথম শিল্পোন্নত দেশে পরিণত হয় এবং দেশটি অর্থনৈতিক ও  রাজনৈতিক দিক থেকে সামনে এগিয়ে যায়। তখন ইংল্যান্ডের শিল্পপণ্য পৃথিবীর সব দেশে রপ্তানি হতো। তাই ইংল্যান্ডকে বলা হতো পৃথিবীর কারখানা (Workshop of the World).

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত ৩টি শিল্পবিপ্লব হয়েছে। প্রথম শিল্পবিপ্লব হয় ১৭৬০ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের মাধ্যমে যা উত্পাদন শিল্পের সম্প্রসারণ ঘটায়। দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লবটি হয়েছে ঊনিশ শতকের  শেষার্ধে এবং বিশ শতকের প্রথমার্ধে ১৮৭০ সালে বিদ্যুত্ আবিষ্কারের মাধ্যমে যা উত্পাদন শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনে। তৃতীয়টি ১৯৬০ সালে তথ্যপ্রযুক্তির উদ্ভবের কারণে। তার ফলে বিভিন্ন শিল্পে অভাবনীয় পরিবর্তন ঘটে। আমরা এখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ‘Industry 4.0’ হিসেবেও পরিচিত। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবটি হবে মূলত ডিজিটাল বিপ্লব। তখন কল-কারখানাগুলোতে ব্যাপকহারে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হবে। শুধু কল-কারখানাই নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থায়ও আসবে আমূল পরিবর্তন। আগের শিল্পবিপ্লবগুলোর ক্ষেত্রে দেখা গেছে মানুষ যন্ত্রকে পরিচালনা করেছে। কিন্তু চতুর্থ বিপ্লবে Artificial Intelligence-এর মাধ্যমে যন্ত্রকে উন্নত করা হয়েছে। যার ফলে যন্ত্র নিজেই নিজেকে পরিচালনা করতে পারবে। এমনিতেই মানুষের  থেকে যন্ত্রের ধারণ ক্ষমতা অনেক বেশি এবং যন্ত্র অনেক নিখুঁত ও দ্রুত কাজ করতে পারে। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ  যে বিষয়টি তাহলো চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে অনেক  লোক তাদের কর্মসংস্থান হারাবে। মানুষের কাজ দখল করে  নেবে উন্নত ধরনের  মেশিন, রোবট ইত্যাদি। অটোমেশিনের কারণে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৮-৪৭%, জার্মানিতে ৩৫%, যুক্তরাজ্যে ৩০%, জাপানে ২১% লোকের চাকরি হারাবার সম্ভাবনা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে বাংলাদেশে  পোশাক শিল্পে ৬০%, আসবাবপত্র শিল্পে ৫৫%, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য খাতে ৪০%, চামড়া ও জুতা শিল্পে ৩৫% এবং পর্যটন ও  সেবাশিল্পে ২০% লোক কাজ হারাবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে তৈরি  পোশাক খাতে ৪৭%, বৃহত্ ও  মাঝারি শিল্পে ২৫% অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়েছে।

পরিবর্তিত পরিস্থিতে একমাত্র তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিরাই টিকে থাকবে। আমাদের  দেশে কারিগরি দক্ষ জনবল মাত্র ১৪%। কারো কারো মতে তা ৩৮%। কিন্তু উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা  দেখতে পাই সেখানে কারিগরিভাবে দক্ষ জনগোষ্ঠী প্রায় ৬০%। তাই আমাদের এখন থেকেই একটি সুপরিকল্পনার মাধ্যমে এগিয়ে  যেতে হবে। দেশে কারিগরি দিক  থেকে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তুলতে আমাদের গার্মেন্টস খাত শ্রমনির্ভর। তুলনামূলক সস্তা শ্রমের কারণে চীন তাদের  দেশ  থেকে কাঁচামাল আমাদের  দেশে পাঠিয়ে  দেয়। তারা এখন  পোশাকখাতে  রোবট কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করছে। এটি বাস্তবায়ন হলে তারা আমাদের  দেশে আর কাঁচামাল পাঠাবে না। ফলে আমাদের শ্রমিকরা এ খাতে তাদের কাজ হারাবে।

শুধুমাত্র আমাদের দক্ষ জনগোষ্ঠী নেই বলে আমাদের পোশাক শিল্পের প্রযুক্তিগত খাতে ২ লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করে। অবাক হই যখন দেখি প্রায় ১ কোটি শ্রমিক বিদেশে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে আমাদের দেশে যে রেমিটেন্স পাঠায় আমরা প্রায় তার অর্ধেকই তুলে দেই মাত্র ২ লাখ বিদেশিদের হাতে। আজ আমরা প্রযুক্তিগতভাবে অনগ্রসর বলেই আমাদের এই অবস্থা।

সঙ্গত কারণেই আমাদের উচিত কারিগরি শিক্ষার উপর জোর দেওয়া। কারণ আগামীতে বেশিরভাগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে শিল্প, কল-কারখানাগুলোকে  কেন্দ্র করে। আর  যে  দেশ শিল্পায়নে যত  বেশি অনগ্রসর সে  দেশ তত  বেশি উন্নত। আমরা যদি সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে না পারি তা হলে অবশ্যম্ভাবীভাবে আমাদের পিছিয়ে পড়তে হবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, পটুয়াখালী বিজ্ঞান

 ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়