এই তো কিছুদিন আগেই পুরান ঢাকার চকবাজারে ঘটেছিল ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা। যে ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছিলেন ৭১ জন, সেই ঘটনার মাত্র ৩৭ দিন অতিবাহিত হতে না হতেই আবারো বনানীর এফআর টাওয়ারের আগুনে প্রাণহানির সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ২৫ জনে। আর এতে ৭৩ জন বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রয়েছেন। ফায়ার সার্ভিস বলছে, গত ১০ বছরে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১০ সালে, পুরান ঢাকার নিমতলীতে। এতে ১২৪ জন নিহত হন। এর পরের বছর সাভারের আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান ১১১ জন। আর ২০১৬ সালে টঙ্গির টাম্পাকো ফয়েলস কারখানার অগ্নিকাণ্ডে মারা যান ৪১ জন।
ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালে সারাদেশে ১৪ হাজার ৬৮২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে ২৭১ জন নিহত ও ৭৯৪ জন আহত হন। ২০১১ সালে ১৫ হাজার ৮১৫টি দুর্ঘটনায় ৩৬৫ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৭৯ জন আহত হন। একইভাবে ২০১২ সালে ২১০ জন নিহত ও ৮০৩ জন আহত, ২০১৩ সালে ১৬১ জন নিহত ও ১ হাজার ৪৭১ জন আহত, ২০১৪ সালে ৭০ জন নিহত ও ২৫০ জন আহত, ২০১৫ সালে ৬৮ জন নিহত ও ২৫৪ জন আহত, ২০১৬ সালে ৫২ জন নিহত ও ২৬৭ জন আহত, ২০১৭ সালে ৪৫ জন নিহত ও ২৮৪ জন আহত এবং ২০১৮ সালে ১৩০ জন নিহত ও ৬৭৭ জন আহত হন। এতে ৪ হাজার কোটি টাকার ওপর আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিসংখ্যান থেকে দেখা গেছে, দেশের আট বিভাগের মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি অগ্নিকাণ্ড ঘটেছে। আর সবচেয়ে কম অগ্নিকাণ্ড হয় সিলেট বিভাগে। নতুন গঠিত ময়মনসিংহ বিভাগেও অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা সিলেটের চেয়ে অনেক বেশি। অন্য বিভাগীয় শহরের তুলনায় ঢাকার আয়তন, ভবন, মানুষের সংখ্যা, কারখানার সংখ্যাসহ সবই বেশি। তাই ঢাকায় ঝুঁকি ও দুর্ঘটনার হার বেশি।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে কয়েকটি কারণে। এরমধ্যে একটি হলো বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট, গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, চুলার আগুন, সিগারেটের আগুন ইত্যাদি। কিন্তু, আসল কথা হলো অগ্নিকাণ্ড যে-কারণেই ঘটে থাকুক না কেন, এটি ঘটার পর মানুষ যেন খুব সহজেই অমূল্য সম্পদ তার জীবন রক্ষা করতে পারে এ ব্যবস্থা থাকতে হবে শতভাগ। কিন্তু রাজধানী জুড়ে গড়ে ওঠা ঘিঞ্জি ইমারতের অধিকাংশেরই এমন ব্যবস্থা অনুপস্থিত। যার ফলে মানবসৃষ্ট এসব প্রাণঘাতী ঘটনা ঘটেই চলছে। আর কর্তৃপক্ষ বারবার ওয়াদা দিয়ে যাচ্ছেন কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। অন্যদিকে অগ্নিপ্রতিরোধের ব্যবস্থা রাখাটা বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ অগ্নিকাণ্ডে জীবন ও সম্পদের অনেক ক্ষতি হয়। অনেকেই মনে করেন, আগুন লাগলে দেখা যাবে, এজন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেন না। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সব ক্ষেত্রেই নিজস্ব প্রতিরোধ ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে অগ্নিকাণ্ডের সময় অন্তত ১০-১৫ মিনিট প্রতিরোধ করা যায়।
বনানীর এফআর টাওয়ারের ঘটনায় বিশেষজ্ঞসহ সবাই বলছেন, ভবনটির ত্রুটি এবং পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকার কথা। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালী জাতীয় অগ্নিসনদ প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বনানীর অগ্নি দুর্ঘটনাকবলিত ভবন পরিদর্শন শেষে তিনিও বলেছেন এফ আর টাওয়ারের দুর্ঘটনাটি ছিল ভুল নকশার ফসল। তাছাড়া বনানীর ঘটনায় প্রমাণিত হলো এখন শুধু পুরান ঢাকা নয়, পুরান ঢাকার পাশাপাশি নতুন ঢাকাও অনিরাপদ। সব স্থানেই ইমারত নির্মাণে অধিকাংশই আইন মানছেন না। বনানীর অগ্নিদগ্ধ ভবনটির মালিক ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করেছেন। আইন প্রতিপালন করানো যাদের দায়িত্ব সেই সিটি করপোরেশন কিংবা রাজউক ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা করলেও কেউ টুঁ শব্দটিও করেনি। অবশেষে যখন বহু মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শত-শত পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ হলো ঠিক তখনই তাদের হুঁশ হলো। তাছাড়া দুর্ঘটনার আগপর্যন্ত রাজউক ও সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেউ খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেন না যে ভবনগুলো আইন মেনে তৈরি করা হয়েছে কি না বা ফায়ার সার্ভিসের কর্তাব্যক্তিরাও খোঁজ নিয়ে দেখেন না যে, এসব বহুতল ভবনে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সঠিকভাবে আছে কি না। যদিও তা থাকা বাধ্যতামূলক।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চাওয়া, আপনি যেভাবে দায়িত্ব বণ্টন করে রাজধানীর পাশাপাশি বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরসহ প্রত্যন্ত অঞ্চলের আনাচে-কানাচে গড়ে ওঠা জঙ্গি আস্তানার মূলোত্পাটন করেছিলেন, ঠিক একইভাবে নির্দেশনা দিয়ে অনুমোদনহীন অপরিকল্পিত ভবনগুলো আগামী ১৫ দিনের মধ্যে চিহ্নিত করুন। এবং পরবর্তীকালে জড়িতদেরকে কঠিন শাস্তির আওতায় আনুন। তাহলেই কথিত দুর্ঘটনার আড়ালে লুকিয়ে থাকা এ হত্যাকাণ্ড চিরতরে বন্ধ হবে।
n লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
