অভাব অনটনের সংসারে ভাতের কষ্ট। পুত্র সন্তান যদি অল্পস্বল্প রোজগার করতে পারে, তাহলে সংসারে টানাটানি একটু হলেও কমে। তারপরও কাজ শিখতে কারখানায় না পাঠিয়ে দুই রিকশা চালক তাদের পুত্রদের ফুটবল শিখতে একাডেমিতে পাঠিয়েছিলেন। বড় ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে নওশের মন্ডলের ছেলে সবুজ হোসেন এবং মজিবর হাওলাদারের ছেলে ইমন প্রাণপণ সংগ্রাম করে গেছে। অনুর্ধ ১৮ বছরের দুই কিশোরের অবস্থান এখন রাজধানীতে। সুন্দর জীবপনযাপনের সঙ্গে তারা মাসে পাঁচ হাজার টাকা সম্মানী পাচ্ছে। সবুজ স্টপার আর ইমন গোলকিপার। দুজন মাগুরার আছাদুজ্জামান ফুটবল একাডেমীর হয়ে ঢাকায় পাইওনিয়ার ফুটবল খেলতে এসে সাইফ স্পোর্টিং যুব দলের প্রশিক্ষন ক্যাম্পে ৫ বছরের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। এটাই তাদের কাছে অনেকটা ‘আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার’ মতো। আমাদের দেশের ফুটবলে প্রানের স্পন্দন ক্ষানিকটা কম হলেও মেধাবী খেলোয়াড়দের আর্থিক সচ্ছলতার নিশ্চয়তা আছে। তাছাড়া ভালো ফুটবল খেলতে পারলে জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তোলা যাবে। সাধারণ মানুষ চিনবে-জানবে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে খেলার সুযোগ ধরা দেবে।
সবুজের বাবা নওশের কুষ্টিয়ায় রিকশা চালান। আর মা সাহিদা বেগম বাসা বাড়ির গৃহপরিচারিকার কাজ করেন। এই কিশোর বলে, ‘পরিবার থেকে বলা হয়েছিল ফুটবল খেলা যাবে না। তার চেয়ে কোথাও কাজ করলে কিছু টাকা রোজগার হবে। কিন্তু সাইফ স্পোর্টিং থেকে বলা হলো ফুটবল খেললেও বেতন পাবে। তখন বাবা মার মন গলে যায়। আমারও সুযোগ হয়। এখন আমাদের সংসারটা বদলে গেছে। কখনো ভাবিনি ফুটবল এভাবে জীবন বদলে দেবে। ৫ হাজার টাকার এক হাজার নিজে রাখি আর বাকিটা মাকে পাঠিয়ে দেই।’ জন্ম তারিখ জানতে চাইলে উত্তর দেয় ‘বলতে পারি না। পাসপোর্টে লেখা আছে।’ পাসপোর্ট কেন জিজ্ঞাসা করলে সে বলে, ‘সাইফের হয়ে ভারতে টুর্নামেন্টে খেলতে গিয়েছিলাম। সেখানে প্লেনে উঠেছি। কোনো দিন ভাবিনি প্লেনে উঠব!’
গোলকিপার ইমন হাওলাদার বরিশালের রাজাপুরের মঠবাড়ী গ্রামের ছেলে। তার বাবা মজিবর ঢাকায় রিকশা চালান। সে বলে, ‘স্কুল ফাঁকি দিয়ে ফুটবল খেলতাম। কিন্তু সংসারে অভাব থাকায় বড় ফুটবলার হবার স্বপ্ন দেখতে পারতাম না। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ভালো ফুটবলারদের টাকার অভাব নেই। এখনই আমাদের কাছে নানা মহল থেকে আকর্ষনীয় প্রস্তাব আসতে শুরু করেছে।’
সবুজের ভালো লাগে জাতীয় দলের স্প্যানিশ ফুটবলার রামোস ও পিকে এবং দেশের তপু বর্মনের খেলা। আর গোলকিপার ইমন বলে, আমি গোলকিপার হয়েছি স্পেনের গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াসকে দেখে।’ এই দুজনের মধ্যে খুব ভালো বন্ধুত্ব। মাঠে কাছাকাছি পজিশনে খেলে। বন্ধুত্বটা আরো গভীর। থাকে একই রুমে। অবসরে ফ্ল্যাটের বারান্দায় বসে যতদুর চোখ যায় অপলক দুরে তাকিয়ে থাকে। তারা স্বপ্ন দেখে ফুটবল খেলে ঘুচবে সংসারের অভাব। উভয়েই দেশের ছোট ফুটবলার থেকে আন্তর্জাতিক মানে পৌছানোর স্বপ্ন একে চলেছে কল্পনার রংতুলিতে।

