সফল বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও ব্রেক্সিট নিয়ে সংকটে

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ০০:৩৯

ব্রেক্সিট নিয়ে যে চরম অনিশ্চয়তা চলছে, তার ফলে ব্রিটিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরাও এখন চরম উদ্বেগে আছেন। তাদের ব্যবসার ওপর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। অনেকে ব্রিটেন থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন ইউরোপে। এদিকে সফট বেক্সিটের জন্য প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে’র ওপর চাপ বাড়ছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের

ব্রিটেনের সবচেয়ে সফল বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের একজন ইকবাল আহমেদ। ব্রিটেনে তিনি সবচেয়ে বেশি চিংড়ি আমদানি করেন, আবার একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি চিংড়ি রফতানি করেন। এজন্য তাকে ‘কিং অব প্রন বা চিংড়ির রাজা’ও বলা হয়। ইকবাল আহমেদের সীমার্ক গ্রুপের ব্যবসা এখন বিস্তৃত ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশে। কিন্তু ব্রেক্সিটকে ঘিরে গত তিন বছর ধরে যে অনিশ্চয়তা, সে কারণে এখন তিনি ব্রিটেন থেকে তার ব্যবসার একটা বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছেন ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। ইকবাল বলেন, ব্রেক্সিটের প্রথম ধাক্কাতেই আমরা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। কারণ পাউন্ডের দাম একদম পড়ে গেল। তারপর এখন তো চলছে অনিশ্চয়তা। ইউরোপে আমাদের যারা কাস্টমার, তারা এখনো বিশ্বাস করতে পারছে না যে আমরা ওদের মালামাল সরবরাহ করতে পারবো। আমরা তাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করছি যে আমরা পারবো, কিন্তু তারপরও তারা উদ্বিগ্ন।

ইকবাল আহমেদ তার সী ফুড এবং অন্যান্য ব্যবসা পরিচালনা করেন ম্যানচেস্টার থেকে। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর তিনি তার ব্যবসা আর সমপ্রসারণ করতে পারছেন না। কারণ তাকে এখন বেশি নজর দিতে হচ্ছে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দিকে। ইকবাল জানান, ইউরোপের সঙ্গে আমার সী ফুডের যে ব্যবসা, গত দুই মাসে সেটা আমি নিয়ে গেছি জার্মানি, বেলজিয়াম এবং পোল্যান্ডে। সেখানে আমরা নতুনভাবে সব কিছু সেট-আপ করেছি। ব্যবসার মূল ম্যানেজমেন্ট আমি ম্যানচেস্টারেই রাখছি। কিন্তু ইউরোপে আমরা যে পণ্য বিক্রি করি, সেটা এখন আমরা ইউরোপেই প্রক্রিয়াকরণ করবো। এটা করার পরই এখন গ্রাহকরা আমাদের ওপর কিছুটা আস্থা ফিরে পেয়েছেন। কিন্তু তার এই সিদ্ধান্তের ফলে ব্রিটেন এরই মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানান তিনি। ইকবাল জানান, আমার এখানে যে দুশো মানুষের চাকরি ছিল, তাদের একশ’ জনের চাকরি চলে যাবে। কারণ ডিস্ট্রিবিউশন, অর্ডার পিকিং, ট্রান্সপোর্ট, এগুলো আর এখানে এত দরকার হবে না। ইকবাল আহমেদ এই অবস্থার জন্য দোষারোপ করছেন রাজনীতিকদের। রাজনীতিকদের ব্যর্থতা এটা। কিছু রাজনীতিকের ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং আকাঙ্খার কারণে আমরা সবাই আজ ভুক্তভোগী।

মেইড ইন ইংল্যান্ড

মামুন চৌধুরী আরেকজন সফল ব্রিটিশ-বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তার ব্যবসার সাফল্যের মূলে ‘মেইড ইন ইংল্যান্ড’ ব্রান্ডিং। ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী ফ্যাশনের নানা রকম কোট তৈরি করে তা রফতানি করে তার কোম্পানি ‘লন্ডন ট্রাডিশন’। মানুষ তাদের পণ্য কেনে এ কারণেই যে, এগুলো ইংল্যান্ডে তৈরি। ব্রেক্সিট নিয়ে অশ্চিয়তায় ইকবাল আহমেদের মতো তার ব্যবসা অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ ‘মেইড ইন ইংল্যান্ডে’র ট্যাগ তিনি ব্যবহার করতে পারবেন না। মামুন চৌধুরী তার কাঁচামালের প্রায় ৯০ভাগ আমদানি করেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে। আবার রপ্তানিও করেন মূলত ইইউ এবং এশিয়ার কিছু দেশে। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তা তার ব্যবসাকে সংকটে ফেলেছে। ব্রিটেনের ইইউ ত্যাগে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক দেওয়া ছাড়াও আরো সমস্যা হবে। আবার রপ্তানির সময় পন্যের দামও বাড়বে।

মামুন চৌধুরী বলেন, তিনি শুধু যে ইউরোপের সঙ্গেই ব্যবসা করতে গিয়ে সমস্যায় পড়বেন তা নয়, অন্য দেশের সঙ্গে ব্যবসায়ও সংকটে পড়তে হবে। যেমন জাপান। গত ফেব্রুয়ারিতে ইইউ এবং জাপানের মধ্যকার চুক্তি অনুযায়ী, ইইউ থেকে জাপানে শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানি করা যায়। অথচ আগে দশ ভাগের বেশি হারে শুল্ক দিতে হতো। কিন্তু চুক্তি ছাড়া ইইউ ত্যাগ করলে বর্তমান সুবিধা পাওয়া যাবে না। ব্রেক্সিট নিয়ে অনিশ্চয়তার রপ্তানি ১৫ ভাগ কমে গেছে বলে জানান মামুন। এমপিরা থেরেসা মেকে সফট ব্রেক্সিটের জন্য চাপ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, ২০১৭ সালেই এই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। তারা ইইউ’র সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিগুলো বহাল রাখার পক্ষে। তবে ইইউ সেই নীতি মানবে কিনা তা জানা যায়নি।