সারা দেশে গত কয়েকদিন ধরে থেমে থেমে ঝড় ও বৃষ্টিতে ফসল ও বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে মাঠের বোরো ধান ছাড়াও অন্যান্য ফসল তলিয়ে গিয়ে কৃষকদের মাথায় হাত উঠেছে। ইত্তেফাক প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো খবর:
নওগাঁ প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণে নওগাঁর মান্দায় তলিয়ে গেছে অন্তত ৫ হাজার হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান। কেটে নেওয়ার আগ মুহুর্তে ধান তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের মাঝে শুরু হয়েছে হাহাকার। কেউ কেউ আবার অর্ধেক ভাগে তলিয়ে যাওয়া ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করছেন। পানিতে উপজেলার ভালাইন ইউনিয়নের গাংতা, চুকাইনগর মহেশপুর, মনোহরপুর পরানপুর ইউনিয়নের হাটোরই ও পরানপুর, ঠাকুরমান্দা বিলের কোঁচড়া, দেউল, দুর্গাপুর, হাড়কিশোর ও রাধানগর এবং তেঁতুলিয়া ইউনিয়নের কুরকুচি ও শ্যাল্লা বিলের ধান তলিয়ে গেছে।
সিংড়া (নাটোর) সংবাদদাতা জানান, প্রচন্ড ঝড়ে নাটোরের সিংড়া উপজেলার ইটালি ইউনিয়নের পাঁচটি লন্ডভন্ড হয়েছে। এতে ওই এলাকার ৪০/৫০ টি ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ছাড়াও গাছপালা, উঠতি বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সোমবার ভোর থেকে থেমে থেমে কালবৈশাখী ঝড় ও বৃষ্টি শুরু হয়, চলে সকাল ৯টা পর্যন্ত। ঝড়ে ইটালি ইউনিয়নের মানিকদিঘি, পাকুরিয়া, কালাইকুড়ি, সাতনদিঘি ও বিক্রমপুর গ্রামে বাড়িঘর, গাছপালা ও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
নড়াইল প্রতিনিধি জানান, দুই দিনের কাল বৈশাখী ঝড়-বৃষ্টি ও শিলাবৃষ্টিতে নড়াইলের ১১ হাজার হেক্টর জমির ধান, পাট, সবজি, অন্যান্য ফসল ও আম-লিচু ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। নড়াইল কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, জেলায় ৪১ হাজার ৩শ ২০ হেক্টর জমিতে আবাদকৃত বোরো ধানের মধ্যে ৯ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এছাড়া পাট ৫৫৫, তিল ২৫৫, সবজি ২৮৫, বোনা আমন ৩৫, মুগ ৫৫, মরিচ ১৫, পানের বরজ ২, আউস ধানের বীজতলা ৩ এবং ৩ হেক্টর জমির চিনা বাদাম পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে।
সাঁথিয়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, গত বুধবার থেকে লাগাতার ভারী বর্ষণে জলাবদ্ধতায় পাবনার শস্য উত্পাদনকারী উপজেলা সাঁথিয়ায় কৃষি ফসল বোরো ধান, পাট, তিল, তরমুজ ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি সাধন হয়েছে। উপজেলার কৃষি প্রধান সকল এলাকায় কৃষকদের বোরো ধান, পাট, তিল, তরমুজ ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়ে পড়েছে। উপজেলার কাটিয়া দহের বিল, ঘুঘুদহ বিলসহ বিভিন্ন বিলের আবাদকৃত বোরো ধান, পাট, তিল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। ধোপাদহ ও কাশিনাথপুর ইউনিয়নের চাষকৃত তরমুজসহ উপজেলা ব্যাপী আবাদকৃত সবজি পানির নিচে রয়েছে।
চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, কয়েকদিনের টানা বর্ষনে পাবনার চাটমোহর উপজেলাসহ চলনবিলাঞ্চলে বিভিন্ন বিল ও নিচু এলাকার উঠতি বোরো ধানসহ বিভিন্ন ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। জমির পাকা ও আধাপাকা ধান দীর্ঘ সময় পানির নিচে তলিয়ে থাকায়,তা পচে যাওয়ার আশংকায় দুঃচিন্তায় পড়েছেন কৃষক।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, রবিবার সন্ধ্যার পর এ উপজেলার উপর দিয়ে কালবাৈশেখী ঝড় বয়ে গেছে। দমকা হাওয়াসহ ঝড়ে ক্ষেতের ইরি ধান ও শাক-সবজিসহ আম বাগানের আমের ব্যাপক ক্ষতিসাধন হয়েছে। ভেঙ্গে পড়েছে সড়কের দু পাশেরসহ গাছ-গাছালির ডালপালা। কালবাৈশেখী ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিসাধন হওয়ায় আম বাগান মালিকদের মাথায় হাত উঠেছে।
চাটখিল ও সোনাইমুড়ি (নোয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, নোয়াখালী জেলার চাটখিল এবং সোনাইমুড়ীতে জলবদ্ধতায় ১৮ হাজার হেক্টর জমির ইরি ধানের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। গত কয়েকদিনে টানা প্রবল বর্ষনের পানি নামতে না পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে ৬২ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন এবং এ বছর এই দুই উপজেলায় ইরি ধান উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হবে।
তাড়াশ (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, লাগাতার বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশের ইরি-বোরো চাষিরা। জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে ধানের ব্যাপক ক্ষতি ও ফলন বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। রোদ না ওঠায় বাড়ির উঠানে ও জমিতে কাটা ধান পচে নষ্ট হচ্ছে।
নাসিরনগর (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা জানান, ভারী বর্ষণে শত শত একর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। উপজেলার ফান্দাউক, ধরমন্ডল, চাপরতলা ও গুনিয়াউক ইউনিয়ন বাদে বাকি ৯টি ইউনিয়নে এক হাজার হেক্টর ইরি-বোরো জমির ধান পানির নিচে চলে গেছে।
মতলব উত্তর (চাঁদপুর) সংবাদদাতা জানান, গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্প ও সেচ প্রকল্পের বাহিরে মুগ, তিলসহ শাক-সবজির ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। মতলব উত্তর উপজেলা মাঠে বর্তমানে ১৭০ হেক্টর জমিতে রয়েছে মুগ, ৭৬ হেক্টর জমিতে রয়েছে তিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, গত ৫ দিনের প্রবল বর্ষণ ও বন্যার পানিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার ৯টি উপজেলায় এক হাজার ৮৪০ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় ৩ কোটি টাকার ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দামুড়হুদা (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, রবিবার রাতে ও সোমবার সকালে উপজেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া প্রচণ্ড ঝড় ও বৃষ্টিতে বেশ ক্ষতি সাধন হয়েছে বলে এলাকার কৃষকরা জানিয়েছে। উঠতি পাকা ধান, কলা, পেঁপে, আম ও কাঁঠাল বাগানের গাছ ভেঙে বড় রকমের ক্ষতিসাধন হয়েছে। নিচু এলাকার পাকা ধান ডুবে গেছে।
হোসেনপুর (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের হোসেনপুরে গত কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতের কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। আর তাই নিম্নাঞ্চলের আবাদকৃত বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। উপজেলা কৃষি অফিসার মোঃ ইমরুল কায়েস জানান, অতি বৃষ্টিতে উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের পানান বিল ও টঙ্গি বিলে ৯০ হেক্টর জমির বোরো ফসল নষ্ট হয়েছে।
বাগেরহাট প্রতিনিধি জানান, উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটে টানা বৃষ্টিতে পাকা বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বৃষ্টির পানিতে বোরো ধানের মাঠ তলিয়ে রয়েছে। ফলে পাকা বোরো ধান মাঠেই নষ্ট হচ্ছে। এই ধান আর কৃষকের ঘরে তোলা সম্ভব হবে না বলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা জানিয়েছেন।
বরিশাল অফিস জানায়, গত পাঁচদিনের টানা প্রবল বর্ষণে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার একর জমির পাকা ও আধা পাকা বোরো জমির ধান, তিল, মুগডাল, মরিচ, ফুট, তরমুজসহ বিভিন্ন ফসল।
নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে চরম দুর্ভোগের মুখে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লাবাসী। মুষলধারের বৃষ্টিতে নিম্নাঞ্চলে ইতোমধ্যে দেখা দিয়েছে ব্যাপক জলাবদ্ধতা। ব্যাহত হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা।
ইত্তেফাক/নূহু
