আগামী অর্থবছর শুরু হতে আরো দুই মাস বাকি। ইতোমধ্যেই আগামী অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেট প্রণয়নের কাজ অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। জানা গেছে, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটের আকার হতে পারে ৪ লাখ ৩০০ কোটি টাকা। সম্প্রতি অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আভাস দিয়েছেন, বাজেটের ঘাটতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যাবে। আর জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ধরা হবে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। যদিও চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৫ শতাংশের নিচে অর্থাৎ ৯২ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা ছিল। চলতি অর্থবছরে জিডিপির আকার (চলতি মূল্যে) ১৯ লাখ ৬১ হাজার কোটি টাকার সমান। বাজেট পেশের আগে থেকেই বাজেটকে কেন্দ্র করে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বাজেট এলেই বড় বড় ব্যবসায়ীদের মধ্যে তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। বড়দের দাবির চাপে ছোট ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগ দাবি নীতি নির্ধারকরা আমলে নিতে পারেন না। অথচ এই ছোট উদ্যোক্তারাই তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থানের নানা সুযোগ সৃষ্টি করছেন। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের বাজেটে পোশাক খাতের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং পোশাকসহ অন্যখাতের মোড়ক পণ্য রপ্তানিতে উেস কর হ্রাস করার দাবি জানিয়েছে গার্মেন্টস ব্যবসায়ীরা। এ জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে উেস কর কমানোর দাবিও জানিয়েছেন তারা। বর্তমানে কার্টন, পলিব্যাগ, হ্যাঙ্গার, বোতাম, লেবেল, জিপার, হ্যাংট্যাগ, গাম টেপসহ পোশাক খাতের ৩০-৩৪ ধরনের সরঞ্জাম এবং অন্যান্য খাতের মোড়ক তৈরি করে এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলো।
বাজেট পেশের আগে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ ব্যবসায়ী সংগঠন আসন্ন বাজেটে তাদের নিজেদের দাবির প্রতিফলন দেখতে চায়। বাজেট অবশ্যই বাস্তবসম্মত এবং বাস্তবায়নযোগ্য হওয়া উচিত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেখা গেছে, বাজেটে যে ব্যয় বরাদ্দ দেওয়া হয় তা পুরোপুরি ব্যয় করা সম্ভব হয় না। বাজেটে কিছুটা উচ্চাভিলাষ থাকবেই। আমাদের দেশে জিডিপির আনুপাতিক হার হিসেবে সরকারের যে ব্যয় সেটা পৃথিবীর অনেক দেশের তুলনায় কম। এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিভিন্নখাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি খাত, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি ইত্যাদি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে। কাজেই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজেটের আকার অবশ্যই বাড়বে। তবে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে বাস্তবতার যোগসূত্র থাকতে হবে।
বাজেটের আকার সেভাবেই নির্ধারণ করা উচিত যতটুকু রাজস্ব আহরণ করা সম্ভব তার উপর ভিত্তি করে। রাজস্ব আহরণের তিনটি উৎস রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড কর্তৃক দেশের মানুষ, ব্যবসায়ী, শিল্প বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান থেকে কর আহরণ। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আওতাবহির্ভূত খাত থেকে কিছু কর আহরিত হয়। যেমন, ভূমি কর। আরেকটি উৎস হলো, নন ট্যাক্স রেভিনিউ অর্থাৎ কর ব্যতীত রাজস্ব আদায়। যেমন, বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যে ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়।
আমাদের এখানে সাধারণত ইনক্রিমেন্টাল বাজেট প্রণীত হয়। আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত বাজেটও এর ব্যতিক্রম হবে বলে হয় না। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের বিশেষ উদ্যোগের প্রতিফলন থাকবে আসন্ন বাজেটে-এটি সহজেই অনুমান করা যায়। যে সব বড় প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে তা দ্রুত শেষ করার একটি প্রচেষ্টা থাকবে। সব মিলিয়ে বাজেটের আকার বড় হবে ধারণা করা যায়।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি খাতের উন্নয়ন, সামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে শিক্ষা স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়ানো যেতে পারে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদি খাতের উপর বেশি জোর দেওয়া উচিত। ব্যবসা বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য সরকারি তরফ থেকে যে ধরনের সহায়তা করা প্রয়োজন তার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীর আকার জোর করে বৃদ্ধি না করে বাস্তবতার নিরিখে প্রণীত হওয়া প্রয়োজন। আমাদের এখানে রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেকটা ভালো হলেও এটা প্রত্যাশিত পর্যায়ে এখন পৌঁছতে পারেনি। করদাতা সাধারণ মানুষ যাতে যথাসম্ভব হয়রানির শিকার না হয়ে সহজভাবে কর প্রদান করতে পারে তেমন ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এখনো কর্পোরেট ট্যাক্সের হার অত্যন্ত বেশি। এটা যৌক্তিকভাবে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এর উপর আবার সুপার ট্যাক্স নির্ধারণ করা যায়। কর বৃদ্ধি না করে বরং করের আওতা বাড়ানো যেতে পারে। অন্য দিকে আদায় ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে আরো যাতে বেশি পরিমাণ কর আদায় করা সম্ভব হয়।
প্রতিবছর বাজেট বাস্তবায়নে যে সমস্যা দেখা দেয় তা সমাধানের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। ইতিপূর্বে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, জমি গ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা, আইনি জটিলতা, সময় মতো কাজ শুরু করতে না পারা ইত্যাদি নানা কারণে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। কিন্তু এসব সমস্যা সমাধানের কোনো কার্যকর উদ্যোগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। তাই বাজেট এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে যাতে তা বাস্তবায়ন করা যায়।
ইত্তেফাক/কেকে
