প্রাণবায়ু যতক্ষণ ততক্ষণই পানি আর পানি

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৯, ২২:১২

শাহেদা ইসলাম

পানির অপর নাম জীবন। কার্যার্থে সুপেয় পানির অপর নাম জীবন। সুপেয় পানি হলো বিশুদ্ধ খাবার পানি, যা পান করা মানুষের জন্য নিরাপদ। যে পানি নিরাপদ নয় সেটি নানা রকম ভারী ধাতু এবং জীবাণু বহন করে। যেখানেই পানি সেখানেই জীবন। পানি ছাড়া জীবনের অস্তিত্ব কল্পনা করা যায় না।

বিজ্ঞানের ভাষায় ব্যাখ্যা করলে পানি, হাইড্রোজেনের দুটি পরমাণু ও অক্সিজেনের একটি পরমাণু দ্বারা গর্বিত এর সাংকেতিক চিহ্ন H20 বলে অভিহিত। যা প্রথম ব্যাখ্যা করেন ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজ রসায়নবিদ উইলিয়াম নিকোলসান। উল্লেখ্য যে, ভূ-পৃষ্ঠের এক ভাগ মাটি এবং দু’ভাগ পানি। আর মোট পানির পরিমাণ আনুমানিক ১,৩৩৮,০০০,০০০ কিউবিক কিলোমিটার। মজার ব্যাপার হলো, এই পানির ৯৭ ভাগই লবণাক্ত, শুধু শতকরা তিন ভাগ স্বাদু পানি। আবার পানির গুণাগুণ ভেদে পানিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। তাহলো খর পানি এবং মৃদু পানি। পানিতে উপস্থিত ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম-এর কার্বনেট বা বাইকার্বনেট-এর দ্রবীভূত লবণ এই খরতার জন্য দায়ী। ছোটবেলায় আমরা শিখেছি বা জেনেছি যে, পানিতে সাবানের ফেনা যদি না হয়, তাহলে সে পানিতে খরতা বেশি। আর যেই পানির খরতা কম, তাকে আমরা মৃদু পানি বলি। জীবনধারণের জন্য পানির মূলত দুটি উত্স তা হলো গভীর নলকূপ এবং ভূ-উপরিস্থ পানি, যেমন-নদী বা লেকের পানি। এই পানি পরিশোধন এবং জীবাণু মুক্তকরণের পর সুপেয় পানির রূপ ধারণ করে। আর ভূগর্ভস্থ পানি প্রাকৃতিকভাবেই পরিশোধিত হয়, কারণ এটা তলদেশের বিভিন্ন লেয়ার যেমন—পাথর, শিলা, কার্বনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে পরিশোধিত হয়। গভীর নলকূপের পানিতে মিনারেল এর পরিমাণ বেশি থাকে। গভীর নলকূপের পানি তিনটি প্রভাবক দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। আবহাওয়া, পানির গভীরতা এবং মাটির তলানি স্তর, যেমন—গরম আবহাওয়ায় পানি দ্রুত বাষ্প হয় এবং পানির মিনারেল দ্রুত মাটি শোষণ করে নেয়। পানির গভীরতা যত বেশি, সেখানে দূষণ হওয়ার সম্ভাবনা একেবারে কম। তৃতীয়ত, তলানি স্তর যত বেশি পানির পরিশোধন প্রক্রিয়া ততই বিস্তৃত।

মানবদেহের ৩ ভাগের প্রায় ২ ভাগ পানি। মানব শরীরে প্রতিদিন ২-২.৫ লিটার পানির প্রয়োজন। পানিকে Universal Solvent বলা হয়ে থাকে। কারণ পানি হলো শরীরের বিভিন্ন ক্রিয়ালাপের স্থপতি। শরীরের বিপাক প্রক্রিয়া পানি ছাড়া সম্ভব নয়। পানিতে যেসকল প্রয়োজনীয় মিনারেল বিদ্যমান তা হলো ক্যালসিয়াম, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, কপার ম্যাঙ্গানিজ এবং ম্যাগনেশিয়াম। আর এই সকল মিনারেল মানবদেহের প্রয়োজনীয় কার্যকলাপে বিশেষ ভূমিকা রাখে। পানিতে বিদ্যমান এই সকল মিনারেল মানব শরীরে সকল বিক্রিয়া বা পরিপাকতন্ত্রের হজম প্রক্রিয়ায় প্রভাবক হিসাবে কাজ করে। শরীরের বিষাক্ত দ্রবণ দূরীভূত করতে পানির ভূমিকা অপরিসীম। পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। এমনকি ক্ষুদ্র রক্তকোষ কৈশিকনালী/ক্ষুদ্র স্নায়ুকোষ এর টেকসই কার্যকারিতা নিশ্চিত করে। মানবদেহের পুষ্টি শোষণের জন্য পানি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। উল্লেখ্য যে, রক্তে প্রায় ৯৬ শতাংশ পানি থাকে। এতদ্ব্যতীত প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত পানি পান করার দরকার নেই এবং খাওয়ার ন্যূনতম ১০ মিনিট পরে পানি পান করা বাঞ্ছনীয়। কেননা তা না হলে হজমে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। পানির মাধ্যমে দেহকোষ পুষ্টি উপাদান সরবরাহের পর বিপাক প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট অবশিষ্ট বর্জ্য ও বিষাক্ত দ্রব্য পানির সাহায্যে প্রস্রাব, মল, ঘাম আকারে বের হয়ে যায়।

অন্যদিকে পানি প্রসঙ্গে কিডনির কথা অপরিহার্য। কিডনিকে সচল রাখতে বিশুদ্ধ পানির বিকল্প নেই। উল্লেখ্য যে, দেহের প্রয়োজনীয় পানি পান না করায় কিডনিতে পাথর হওয়াসহ জটিলতার কারণে বহু লোক মারা যায়। প্রতিবছর কিডনিজনিত রোগীর সংখ্যা ৫% থেকে ১০% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাধারণত প্রতিদিন আমরা খাবারের সাথে বিভিন্ন ধরনের লবণ গ্রহণ করে থাকি। সেই সকল লবণের ক্রিস্টাল বা দানাদার আকার বিশুদ্ধ পানি পানে কিডনির মাধ্যমে পরিশোধিত হয়ে বের হয়ে যায়। কিন্তু পর্যাপ্ত পানি পান না করলে ঐ সকল দানাদার পদার্থ জমাট বেঁধে টুকরো টুকরো পাথরে পরিণত হয়।

পরিশেষে পানির গুণাগুণ ও বৈশিষ্ট্য এই স্বল্প পরিসরে বলে শেষ করা যাবে না। প্রাণবায়ু যতক্ষণ আছে ততক্ষণই পানি আর পানি। দৈনন্দিন জীবনে একদিন ইলেকট্রিসিটি বা গ্যাস না থাকলেও চলে যাবে, কিন্তু পানি না থাকলে এক মুহূর্তও চলবে না।

n লেখক : মাইক্রোবায়োলজিস্ট