বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের আক্ষেপ

দলবাজদের কারণে যোগ্যতার মূল্যায়ন হয় না

আপডেট : ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ২২:৩৯

বাম কিডনি কাটতে গিয়ে দুই কিডনি অপসারণের ঘটনায় সারাদেশে চিকিত্সকদের ওপর আস্থার সংকট দেখা দিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে চলছে বিতর্কের ঝড়। ফেসবুক, ব্লগ, টুইটার, পত্রিকার পাঠক মতামত সর্বত্রই আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক হচ্ছে এই চিকিত্সা ইস্যুতে। বিশেষজ্ঞ   চিকিত্সকরা অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, আমরা চিকিত্সকদের ক্ষেত্রে দলবাজদের গুরুত্ব দেই। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করি না। এ কারণেই এমন অঘটন ঘটনা ঘটছে। আওয়ামী লীগ আমলে স্বাচিপ ও বিএনপি আমলে ড্যাব’র এক শ্রেণীর নেতাদের দাপটের কারণে একদিকে চিকিত্সা সেবায় দুর্নাম ছড়াচ্ছে, দায়িত্বে অবহেলার ঘটনাও ঘটছে বলেও বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা অভিমত ব্যক্ত করেন। তারা আরো বলেন, সারা বিশ্বে চিকিত্সা বিজ্ঞানের গবেষণায় এবং ওষুধের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে। যারা দলবাজ চিকিত্সক তারা কিভাবে এসব সম্পর্কে কিভাবে অবগত হবে? তবে ভুল চিকিত্সার ঘটনা সারাবিশ্বেই ঘটছে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে ২০১৭ সালে আমেরিকায় ১৬ হাজার রোগী ভুল ওষুধে মারা যান। তবে ওসব দেশে নেতিবাচক প্রচার কম হয়।

গত ৫ সেপ্টেম্বর চলচ্চিত্র নির্মাতা রফিক শিকদারের মা রওশন আরার বাম পাশের কিডনিতে অস্ত্রোপচার করেন বিএসএমএমইউয়ের ইউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে চিকিত্সকরা। পরে জানা যায়, তার ডানপাশের কিডনিটিও নেই। গত ৩১ অক্টোবর চিকিত্সাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে ২২ সেপ্টেম্বর তদন্ত কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তদন্ত কমিটি ইতিমধ্যে রিপোর্টও দিয়ে দিয়েছে। এখন তার বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া যায় সেটি ঠিক করতে নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ছয় সদস্যের এই কমিটির প্রধান হলেন বিএসএমএমইউয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেল (শিক্ষা) অধ্যাপক ডা. সাহানা আখতার রহমান। কমিটির সদস্যরা হলেন এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্জারি অনুষদের ডীন অধ্যাপক মো. জুলফিকার রহমান খান, সিন্ডিকেটের সদস্য অধ্যাপক ডা. কাজী শহীদুল আলম, অধ্যাপক ডা. সজল কৃঞ্চ ব্যানার্জী, ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এ কে এম খুরশিদুল আলম ও রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল হান্নান। এই কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট শাস্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া জানান, একজন ডাক্তারের জন্য পুরো চিকিত্সক সমাজের ওপর আস্থার সংকট সৃষ্টি হতে পারে না। তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

জানা গেছে, বাংলাদেশে অনেক জটিল রোগের চিকিত্সা হচ্ছে। সিঙ্গাপুরও যে জটিল অপারেশন করতে পারেনি, বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়েছে। দেশে চিকিত্সা ক্ষেত্রে প্রায় প্রতিটি বিশেষায়িত চিকিত্সা বিভাগের আলাদা ইনস্টিটিউট হয়েছে। ইতিমধ্যে ৫০০ বেডের শেখ হাসিনার ন্যাশনাল বার্ণ এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট চালু হয়েছে। পৃথিবীর কোথাও এত বড় ইনস্টিটিউট নেই। এছাড়া নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট, ইএনটি ইনস্টিটিউট, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটও আছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের চিকিত্সা সেবা আন্তর্জাতিক মানদন্ডে নিয়ে যেতেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। বিএসএমএমইউয়ের পাশাপাশি আরো তিনটি মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে। এসব স্থানে বিশেষায়িত চিকিত্সক তৈরি হচ্ছে, চিকিত্সা বিজ্ঞানেও ব্যাপক অগ্রগতি হচ্ছে। অন্যদিকে দেশের প্রখ্যাত চিকিত্সক হলেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহর লেখা বই বিশ্বব্যাপী ব্যাপক জনপ্রিয়। পৃথিবীর বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে তার লেখা বই পড়ানো হয়। এত সফলতার পরও দলবাজ কিছু চিকিত্সকদের কারণে চিকিত্সক সমাজ দুর্নামে পড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, পদায়নের ক্ষেত্রে চিকিত্সকদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করা হয়। তবে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ডাক্তার-নার্সসহ সকলেরই দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

বিএমএ’র মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, ভুল চিকিত্সা শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বেই হয়। অথচ সেখানে কোন কোন হামলার ঘটনা ঘটেনি। বাংলাদেশে এমন ঘটনা ঘটলে তুলকালাম হয়ে যেত। তবে আমাদের দেশে একটু কিছু হলেই ব্যাপক প্রচার ও আলোচনায় আসে। এতে ডাক্তারের ওপর হামলা হয়। অথচ ভুল চিকিত্সার জন্য একাডেমিক ব্যবস্থা নেওয়ার জায়গা আছে।

স্বাচিপের মহাসচিব ডা. এমএ আজিজ বলেন, স্বাচিপ কখনো কোন কাজে প্রভাব খাটায় না। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে মূল্যায়ন করে। যদি কোন প্রতিষ্ঠানে যদি চিকিত্সায় অবহেলা কিংবা ভুল চিকিত্সা হয়ে থাকে, তাহলে কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিলে কোন খাটায় না। ঢালাওভাবে স্বাচিপের চিকিত্সকদের দোষারোপ করাও সঠিক না। তিনি বলেন, চিকিত্সা সেবার বৃহত্তর স্বার্থে দ্রুত চিকিত্সা সেবা সুরক্ষা আইন চালু করা  প্রয়োজন। এ আইনটি বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদে যাওয়ার অপেক্ষায় আছে। এ আইনটি বাস্তবায়িত হলে রোগী, চিকিত্সকসহ চিকিত্সা সেবায় জড়িত সকলেই উপকৃত  হবে।