এক দেশে ছিল একজন গরিব লোক আর তার সুন্দরী বউ।
শীতের সন্ধ্যায় কুঁঁড়েঘরের মধ্যে আগুনের সামনে বসে স্বামী-স্ত্রী তাদের অভাবের কথা ভেবে হা-হুতাশ করছিল আর প্রতিবেশীরা কত সুখে আছে সে কথাই বলাবলি করছিল।
বউটি আফসোস করে বলল, ‘আহা! আমি যদি ইচ্ছা করা মাত্র সবকিছু পেতাম তাহলে আশপাশের সবার চেয়ে কত সুখেই না থাকতাম।’
স্বামীটি বলে উঠল, ‘আমিও ঠিক তা-ই ভাবছি।’
ঠিক সেই মূহূর্তে ঘর আলো করে একজন সুন্দরী পরি হাজির হয়ে বলল, ‘দ্যাখো, আমি একজন পরি, আমি তোমাদের তিনটি ইচ্ছা পূরণ করবো। কিন্তু সাবধান, প্রথম তিনটি ইচ্ছার পর কিন্তু আর কোনো ইচ্ছা পূরণ করতে পারবো না।’
কথাটা বলেই পরি অদৃশ্য হয়ে গেল।
ঘটনার আকস্মিকতায় লোকটা আর তার বউ কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে ছিল, তারপর আচমকা ঘোর কাটিয়ে উঠে ভেবেই পেলো না কী চাইবে।
বউ বলল, ‘আমি ঠিক করেছি এক্ষুনি কিছু চাইবো না, তবে ভাবছি আরো সুন্দরী, ধনী আর অভিজাত মহিলা হওয়াটাই সবচেয়ে ভালো।’
স্বামীটি মন্তব্য করল, ‘কিন্তু, এগুলো হলেও তো মানুষ দুঃখী হতে পারে, অসুস্থ হতে পারে, আর তাড়াতাড়ি মরেও যেতে পারে। তার চেয়ে বরং সুস্বাস্থ্য, সুখী এবং দীর্ঘজীবন চাওয়াটা বুদ্ধিমানের কাজ।’
‘অনেক দিন বেঁচে থেকে কী লাভ যদি টাকা-পয়সা না থাকে?’
‘তবে চলো সারারাত ভেবে দেখি কোন তিনটা জিনিস সবচেয়ে বেশি দরকার আমাদের, তারপর সেইভাবে দুজনে মিলে তিনটা ইচ্ছার কথা জানাবো। এখন চলো শীতের মধ্যে ভালোমতো গা গরম করে নিই।’
বউটি একটা কাঠি নিয়ে আগুনটা একটু উসকে দিয়ে একমনে গনগনে আগুনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাত্ কিছু না ভেবেই বলে উঠল, ‘কী সুন্দর আগুন জ্বলছে এখন। একটু আটার কাই পেলে সুন্দর রুটি বানিয়ে নিতে পারতাম।’
যেই না মুখ থেকে কথাটা বেরিয়েছে, অমনি ঠকাস করে একদলা মাখানো আটা আগুনের ঠিক সামনে এসে পড়ল।
‘ধুত্তরি, তোমার আটার কাই’, স্বামীটা হায় হায় করে উঠল, ‘গেল তো একটা সুন্দর ইচ্ছা। এখন বাকি রইলো মাত্র দুটো, খুব ভালো হতো যদি আটার দলাটা তোমার নাকের সামনে ঝুলে থাকতো।’
সঙ্গে সঙ্গে লোকটা টের পেলো তার বউয়ের চেয়েও সে কত আহাম্মুকের মতো কথা বলেছে। আর যায় কোথায়, মুখ থেকে কথাটা বেরুতে না বেরুতেই আটার দলাটা লাফ দিয়ে বউয়ের নাকের ডগায় লেগে লম্বা হয়ে ঝুলে রইল। অনেক টানাটানি করেও বউ সেটাকে নামাতে পারল না।
বউটা কেঁদে উঠল, ‘হায় হায়, তুমি এটা কী করলে! কী রকম বদলোক তুমি, আমার নাকের ওপর এই কিম্ভূতকিমাকার আটার দলাটা ইচ্ছা করে আটকে দিলে!’
স্বামীটি বলল, ‘সত্যি বলছি বউ, আমি মোটেই এটা চাইনি।’
‘আমি এক্ষুনি তিন নম্বর ইচ্ছা জানাচ্ছি যেন আমাদের অনেক ধনসম্পদ হয়, তাহলে আমি সোনার একটা বাক্স বানিয়ে তোমার নাকটা ঢেকে দেবো।’
বউটি তার নতুন লম্বা ঝুলন্ত নাকটা নেড়ে বলল, ‘খবরদার, তুমি যদি এরকম কিছু চাও, নাকের ওপর সোনার বাক্স নিয়ে থাকার চেয়ে আমি বরং বিষ খেয়ে মরে যাবো। আরেকটা মাত্র ইচ্ছা আছে ওটা আমাকে চাইতে দাও, নইলে আমি জানালা দিয়ে বাইরে ঝাঁপ দেবো।’
কথাটা বলেই বউ জানালা খুলতে গেল, কিন্তু গরিব লোকটা তার বউকে খুব ভালোবাসত, তাই সে বাধা দিয়ে বলল, ‘লক্ষ্মী বউ, থামো, শেষ ইচ্ছাটা তুমিই বলো।’
বউটি বলল, ‘ঠিক আছে। আমি চাই আটার ঢেলাটা মাটিতে পড়ে যাক।’
সঙ্গে সঙ্গে ওটা বউয়ের নাক থেকে আলগা হয়ে মাটিতে পড়ে গেল।
বুদ্ধিমতী বউটি বলল, ‘পরি আমাদের বোকা বানিয়েছে এবং সে ঠিক করেছে। আমাদের যদি অনেক টাকা থাকত তাহলে আমরা এমন শান্তিতে থাকতাম না। আর কক্ষনো কিছু চাইবো না, আল্লাহ খুশি হয়ে যা দেবেন তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকবো। এখন চলো এই আটার কাই দিয়ে ক’টা রুটি সেঁকে নিই, তিনটি ইচ্ছা থেকে এখন কেবল এটাই আমাদের পাওনা হয়েছে।’
স্বামীটা বুঝল বউ ঠিক কথাই বলেছে। ওরা খুশিমনে রাতের খাবার খেল, এরপর ওরা আর কখনো অসম্ভব কল্পনা করে ওদের মনকে কষ্ট দেয়নি।
