শতবর্ষে নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী

আপডেট : ০৪ এপ্রিল ২০১৯, ২০:২২

১ জানুয়ারি ১৯১৯-এ বাংলায় জন্ম নিয়েছিলেন এক শিশু। পিতামাতা তাঁর নাম রেখেছিলেন রশিদ আহমেদ চৌধুরী (টুনু)। শৈশব পেরিয়ে কৈশোর, কৈশোর পেরিয়ে যৌবন। যৌবনে এসেই নিজেই নিজের নাম বদলে দেন বুলবুল চৌধুরী’। বুলবুল চৌধুরী একটি নাম, একটি কিংবদন্তি এই উপমহাদেশে একটি শিল্পধারার সমার্থক শব্দ—যে শব্দটি ‘নৃত্যকলা’।

আমরা যদি ইতিহাস, প্রাগ-ইতিহাস অর্থাত্ ইতিহাসের প্রত্নতত্ত্বের দিকে তাকাই। কী দেখতে পাই? দেখতে পাই ইতিহাসের কোনো এক বাঁকবদলে মহিরুহের মতো দাঁড়িয়ে আছেন কোনো একজন মানুষ, কোনো একজন ব্যক্তিত্ব—যিনি বদলে দিয়েছেন ইতিহাস, বদলে দিয়েছেন মানুষের জীবনধারা। জন্ম নিয়েছে নতুন সংস্কৃতি, নতুন শিল্পধারা, নতুন এক মূল্যবোধ। আমাদের এই উপমহাদেশের তেমনি একজন মানুষ যিনি পৌঁছে গিয়েছিলেন মানবীয় গুণাবলীর সর্বোচ্চ চূড়ায়। জন্ম দিয়েছেন নৃত্যকলার এক নতুন মুখ (১৯১৯-১৯৫৪) ‘সৃজনশীল নৃত্য’। আজো যে ধারা আমরা বহন করে চলছি নৃত্যকলার বাঁকে-বাঁকে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে। অতীত আমাদের বলে, নৃত্যকলার জন্ম নিয়েছিল দেবালয়ে, রাজদরবারে, অথবা উঁচুতলার মানুষের মনোরঞ্জনে।

নৃত্যাচার্য বুলবুল চৌধুরী শুধু বিনোদন বা মনোরঞ্জন নয়, নৃত্যকলাকে বেছে নিলেন মানুষের চেতনা বিকাশের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর শিল্পচেতনা উন্মেষে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল কবি নজরুল, নৃত্যাচার্য উদয় শংকরসহ তত্কালীন মুক্তবুদ্ধির চর্চার প্রগতিশীল মুসলিম সাহিত্য সমাজ তথা ঢাকাকেন্দ্রিক শিখা গোষ্ঠী। সমাজ-রাষ্ট্রের সংস্কারাচ্ছন্ন, সুবিধাভোগী শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই করে নৃত্যকলাকে নিয়ে এলেন সাধারণ মানুষের দরজার সামনে। তাঁর স্বল্পদীর্ঘ ৩৫ বছর জীবনেই কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন এক মহান দায়িত্ব। কীভাবে এই ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষকে বিশেষ করে বাংলার মানুষকে বের করে নিয়ে আসা যায় কুসংস্কার থেকে, অন্ধত্ব থেকে, শাসক শ্রেণির শৃঙ্খল থেকে নৃত্যকলার জাদুমন্ত্রে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন মানুষের বেড়ে ওঠা বা বিকশিত হওয়ার একমাত্র অন্তরায় হচ্ছে তার কুসংস্কারাচ্ছন্ন বোধ। যে বোধকে ভাঙতে পারে শুধু একমাত্র সাহিত্য-শিল্পকলা। তিনি বেছে নিলেন শিল্পের এক প্রাচীন ধারা ‘নৃত্যকলা’। তিনি নৃত্যপ্রকাশে প্রথাগত নৃত্যমুদ্রায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখলেন না। তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রকৃতির প্রতিটি উপাদানের কাছে। হাত বাড়িয়ে দিলেন প্রান্তিক মানুষের প্রতিদিনের সংগ্রামী জীবনের প্রকাশভঙ্গির কাছে, সুখ-দুঃখের কাছে এবং দৃষ্টি প্রসারিত করে দিলেন পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলের পুরাণ বা আখ্যানের দিকে। জন্ম দিলেন সৃজনশীল এক নৃত্যধারার। ভাবতে অবাক লাগে যে, যেই মানুষটির ছিল না নৃত্যকলার ওপরে প্রথাগত কোনো শিক্ষা অথচ সেই মানুষটি হয়ে উঠলেন নৃতকলার এক মহান জাদুশিল্পী। তিনি শুধু নৃত্যেই থেমে ছিলেন না, নিজেকে আরো প্রকাশ করেছিলেন কবিতায়, গল্পে, উপন্যাসে, চিত্রকলায়, সংগীতে এবং শিল্পের অন্যান্য মাধ্যমেও।

বুলবুল চৌধুরীর অকাল প্রয়াণে তাঁর স্বপ্নের ‘জাদুর কাঠি’ হাতে তুলে নিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু মাহমুদ নুরুল হুদা। তিনি বুলবুল চৌধুরীর অকালপ্রয়াণের দ্বিতীয় বর্ষে ১৭ মে ১৯৫৫ সালে তাঁর ‘স্বপ্ন-স্মৃতি’ বাঁচিয়ে রাখতে প্রতিষ্ঠিত করেন বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টস (বাফা)। যেটি শুরু হয়েছিল ঢাকার বুড়িগঙ্গার তীরে ইতিহাস বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ৭নং ওয়াইজ ঘাটে অবস্থিত ওয়াইজ হাউজে। সে সময়ে তাঁর এই মহত্কর্মে সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছিলেন সমাজের অনেক স্বনামধন্য মহত্ ব্যক্তিবর্গ। যা এখনো বাফার ইতিহাসের পাতায় জ্বলজ্বল করছে।

এই মহান ব্যক্তিত্বের শততম জন্মবার্ষিকীতে তাঁর কর্ম-স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করছি।

বুলবুল চৌধুরী

জন্ম :১ জানুয়ারি ১৯১৯