আজ ১৯ জুলাই বাংলা কথাসাহিত্যের অতলস্পর্শী জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের পঞ্চম মৃত্যুবার্ষিকী। অসাধারণ সব চরিত্র নির্মাণ, আলেখ্য তৈরিতে বিস্ময়জাগানিয়া প্রতিভার অধিকারী এই লেখককে নিয়ে এবারের আয়োজন
১৯৫০-৫৫ সালের দিকে সিলেটের মীরা বাজার। গাছপালা শোভিত, প্রাচীন আমলের ঘরদোর, ভাঙা রাস্তা কোথাও কোথাও কাঁচা বাড়ি। স্কুল ছুটির পর এমনি এক রাস্তা ধরে হেঁটে চলছে এক বালক। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই, যেন কোনো একদিকে গেলেই হলো। ইচ্ছে হলো আর হুট করে ঢুকে পড়ল কোনো বাড়িতে। সেখানে গাছগাছালিতে ছাওয়া ধবধবে সাদা বাংলো প্যাটার্নের একটা বাড়ি। সিলেট এমসি কলেজের রসায়ন শাস্ত্রের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান এস কে রায় চৌধুরী সাহেবের বাড়ি এটা। বালকের কাছে অধ্যাপকের পরিচয় হচ্ছে প্রফেসর সাব, অতি জ্ঞানী লোক— যাঁকে দূর থেকে দেখলেই পুণ্য হয়। এক দুপুরে সেই প্রফেসর সাবের বাড়ির গেট খোলা পেয়ে হুট করে ঢুকে পড়ে বালক। একা একা অনেকক্ষণ হাঁটে। হঠাত্ দেখতে পায়, কোনার দিকে একটি গাছের নিচে পাটি পেতে ষোল-সতের বছরের একটি মেয়ে উপুর হয়ে শুয়ে আছে। তার হাতে বই। সে বই পড়ছে না—তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। বালকের মনে হলো এত সুন্দর মেয়ে সে আর দেখেনি। মনে হচ্ছে মেয়েটির শরীর সাদা মোমের তৈরি। মেয়েটি হাত ইশারায় তাঁকে ডাকল। কাছে যেতেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, কী নাম তোমার খোকা?
কাজল, বালকের উত্তর।
এই কাজল যিনি বড় হয়ে বাংলা কথাসাহিত্যে এক স্বপ্নলোক রচনা করেন। আর এই স্বপ্নলোকের চাবি তাঁর হাতে তুলে দিয়েছিলেন প্রফেসর সাহেবের সেই মেয়েটি, যার নাম শুক্লা। আর সেই ছবিটির নাম অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ক্ষীরের পুতুল’।
কাজল সিলেট থানার ওসি ফয়জুর রহমান সাহেবের বড় ছেলে। থানার দারোগা পুলিশ সাধারণত যেমন হয়, এই একটু খিটিমিটি স্বভাব, একটু আধটু ঘুষ, জনতা দেখে অযথাই ধমক দেওয়া—তেমন নন এই ওসি সাহেব। বিপরীতে কবিতার প্রতি ঝোঁক, গানের প্রতি দরদ, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর কিছুটা বিচিত্র খেয়াল নিয়ে এই ওসি সাহেবের জীবন। ইনি পূর্ণিমার রাতে শিশুদের আকাশ দেখাতে ভালোবাসেন। রাত দুপুরে স্ত্রীর বায়না মেটাতে দুজনে মিলে নেমে যান পুকুরে। মাসিক বেতন নব্বুই টাকা যার একটা অংশ পাঠিয়ে দেন গ্রামের বাড়িতে, এক অংশ দিয়ে প্রতি মাসে বই কেনেন, আর বাকি যা থাকে তা তুলে দেন স্ত্রীর হাতে, আর তিনি থাকেন সারা মাস নিশ্চিন্ত।
এই খেয়ালি মানুষটিই একদিন পাহাড়ের মতো কঠিন আর অটল হয়ে গিয়েছিলেন। তখন ১৯৭১ সাল। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বছর। তিনি তখন পিরোজপুর থানার ওসি। পাকিস্তানি হায়েনারা তাঁর সামনে এলে তিনি পাহাড়ের মতো অটল ও স্থির থেকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন মৃত্যুকে। এই শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ সাহেবের বড় ছেলে কাজল আমাদের আজকের বাংলা কথাসাহিত্যের নতুন স্রোতের নকিব হুমায়ূন আহমেদ।
পাকিস্তান জন্মের পরের বছর জন্ম হুমায়ূন আহমেদের। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর মাতুলালয়ে, নেত্রকোনা জেলার মোহনগঞ্জের কুতুবপুর গ্রামে। বাবা ফয়জুর রহমান ও মা আয়েশা ফয়েজের প্রথম সন্তান তিনি। ফলে বাড়াবাড়ি রকমের আদরের মধ্য দিয়ে তাঁর শৈশবের দিনগুলো পার হতে থাকে। বাবার ধারণা ছিল তাঁর প্রথম সন্তান হবে মেয়ে। তিনি মেয়ের নামও ঠিক করে রেখেছিলেন। ফলে তিনি তাঁর এই পুত্র সন্তানটিকে মেয়েদের সাজে সাজিয়ে রাখতেন। লম্বা চুলে মা বেণি করে দিতেন। তাঁর শৈশবের প্রথম অধ্যায়টি যতটা স্নেহ ও মমতায় কেটেছে দ্বিতীয় অধ্যায়টি কেটেছে ততটাই বঞ্চনার ভেতর দিয়ে।
শৈশবে তাঁর মা টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বর থেকে সুস্থ হওয়ার পর তাঁর স্মৃতিবিভ্রম দেখা দেয়। তিনি কাউকেই চিনতে পারতেন না, এমনকি তাঁর ছেলেকেও না। ফলে হুমায়ূন আহমেদকে পাঠিয়ে দেয়া হয় নানার বাড়ি মোহনগঞ্জে। সেখানে দু বছর তিনি নানা-নানির আদরে বেড়ে ওঠেন। দু বছর পর মা সুস্থ হয়ে উঠলে ফিরে আসেন মায়ের কাছে।
শৈশবে হুমায়ূন আহমেদ যত জায়গায় গিয়েছেন তার মধ্যে তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ছিল দিনাজপুরের জগদ্দল। এর প্রধান কারণ ছিল তাঁরা যেখানে থাকতেন তার আশেপাশে কোনো স্কুল ছিল না। স্কুলের কথা মনে হলেই হুমায়ূন আহমেদের মুখ এমন তেতো হয়ে যেত যে, মনে হতো যেন তাঁর মুখে জোর করে কেউ ঢেলে দিয়েছে নিশিন্দা পাতার রস। বাবা-মা তাঁকে স্কুলে পাঠাতেন বটে তবে স্কুলে সময় কাটাতেন কেবল দুষ্টুমি করে। টেনে টুনে পাশ করতেন। প্রাইমারি স্কুল পাশের পর এই হুমায়ূন বদলে যান। ষষ্ট শ্রেণিতে ওঠার পর থেকে স্কুলের প্রতি তাঁর আগ্রহ বাড়তে থাকে। আগ্রহটা এমনই ছিল যে এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট হওয়ার পর দেখা গেল তিনি সম্মিলিত মেধা তালিকায় দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছেন। ১৯৬৫ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে তিনি এসএসসি পাস করেন। ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬৭ সালে তিনি এইচএসসি পাস করেন। এইচএসসি পরীক্ষাতেও তিনি মেধা তালিকায় স্থান করে নিয়েছিলেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। ১৯৭২ সালে রসায়ন বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর পাস করে তিনি একই বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৮২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে প্রফেসর যোসেফ এডওয়ার্ড গ্লাসের তত্ত্বাবধানে পলিমার কেমিস্ট্রিতে পিএইচডি ডিগ্রি নেন। ড. হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখিতে অধিক সময় এবং চলচ্চিত্রে নিয়মিত সময় দেবার জন্য পরবর্তী সময়ে অধ্যাপনা পেশা ছেড়ে দেন।
বাংলাদেশের লেখালেখির ভুবনে প্রবাদ পুরুষ হুমায়ূন আহমেদ। গত ত্রিশ বছর ধরেই তাঁর তুঙ্গস্পর্শী জনপ্রিয়তা। ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাস দিয়ে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ‘নন্দিত নরকে’ যখন প্রকাশিত হয় তখনই বোঝা গিয়েছিল কথাসাহিত্যের কঠিন ভুবনে তিনি হারিয়ে যেতে আসেননি, থাকতেই এসেছেন। ফলে এদেশের সাহিত্যাকাশে তিনি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করছেন। তাঁর মধ্যে এই অমিত সম্ভাবনা তখনই টের পেয়ে প্রখ্যাত লেখক সমালোচক আহমদ শরীফ এক গদ্যের মাধ্যমে তাঁকে অভিনন্দিত করেছিলেন।
আহমদ শরীফের প্রশংসা যে অপাত্রে ছিল না তা তো আজ সর্বজনবিদিত। মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা সহজ-সরল গদ্যে তুলে ধরে পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে রেখেছেন আজ পঁয়ত্রিশ বছর ধরে।
শুধু মধ্যবিত্ত জীবনের কথকতা বয়ানেই সীমিত নয় তাঁর কৃতিত্ব, বেশ কিছু সার্থক সায়েন্স ফিকশন-এর লেখকও তিনি। জনপ্রিয় চরিত্র মিসির আলী ও হিমুর স্রষ্টা তিনি—যে দুটি চরিত্র যথাক্রমে লজিক এবং অ্যান্টি লজিক নিয়ে কাজ করে।
হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যের ভিতটা গড়ে ওঠে পারিবারিক বলয় থেকেই। বাবা ছিলেন সাহিত্যের অনুরাগী। বাসায় নিয়মিত সাহিত্য আসর বসাতেন, সেই আসরের নাম ছিল সাহিত্য বাসর। গল্প লিখার অভ্যেসও ছিল তাঁর। যদিও সেসব গল্প কোথাও ছাপা হয়নি। তবে গ্রন্থাকারে তা প্রকাশিত হয়েছিল। গ্রন্থের নাম ‘রিক্তশ্রী পৃথিবী’। তাঁর বাবা, সন্তানদের মধ্যে যেন সাহিত্যবোধ জেগে ওঠে সে চেষ্টা করেছেন সবসময়। মাঝে মাঝে দেখা যেত তিনি নির্দিষ্ট একটা টপিক দিয়ে ছেলেমেয়েদের কবিতা লিখতে বলতেন, ঘোষণা করতেন—যার কবিতা সবচেয়ে ভালো হবে তাকে দেওয়া হবে পুরস্কার। হুমায়ূন আহমেদের বড় মামা শেখ ফজলুল করিম যিনি তাঁদের সঙ্গেই থাকতেন এবং যিনি ছিলেন তাঁদের সার্বক্ষণিক সঙ্গী, তিনি কবিতা লিখতেন, লিখতেন নাটক এবং সেই নাটক তিনি তাঁর ভাগ্নে-ভাগ্নিদের দিয়ে বাসায় গোপনে গোপনে মঞ্চস্থও করাতেন। আর হুমায়ূন আহমেদের নিজের ছিল গল্প-উপন্যাসের প্রতি অসাধারণ টান। তাঁর এই টান তৈরি করে দিয়েছিলেন মীরা বাজারের প্রফেসর রায় চৌধুরী সাহেবের মেয়ে শুক্লা। যিনি তাঁকে ‘ক্ষীরের পুতুল’ নামের বইটি উপহার দিয়ে সাহিত্যের প্রতি এই অসাধারণ টানের সৃষ্টি করেছিলেন।
‘ক্ষীরের পুতুল’ হলো হুমায়ূন আহমেদের পড়া প্রথম সাহিত্য। যদিও তাঁর বাবার বিশাল লাইব্রেরি ছিল। কিন্তু সমস্ত বই তিনি তালাবদ্ধ করে রাখতেন। তিনি হয়তো ভেবেছিলেন তাঁর বাচ্চাদের এসব বই পড়ার সময় এখনো হয়নি। কিন্তু ‘ক্ষীরের পুতুল’ পড়ার পর তিনি তাঁর বাবার বইয়ের আলমিরা থেকে বই চুরি করে লুকিয়ে পড়তে শুরু করলেন এবং একদিন বাবার হাতে ধরা খেলেন। বাবা তাঁকে নিয়ে গেলেন সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে। বইয়ের এক বিশাল সংগ্রহ সেখানে। যেদিকে চোখ যায় শুধু বই আর বই। বাবা তাঁকে লাইব্রেরির মেম্বার করে দিলেন। সম্ভবত তিনিই ছিলেন এই লাইব্রেরির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য। এইভাবে হুমায়ূন আহমদের সাহিত্যের প্রতি জন্ম নেয় গভীর ভালোবাসা।
যদিও তাঁর প্রথম রচনা ‘নন্দিত নরকে’ তবে তারও বহু পূর্বে তিনি একটি সাহিত্য রচনা করেছিলেন। দিনাজপুরের জগদ্দলে থাকা অবস্থায়। জগদ্দলের যে জমিদার বাড়িতে তাঁরা থাকতেন, সেখানে জমিদারের পরিত্যাক্ত সম্পত্তির তালিকায় ছিল একটি কুকুর। জমিদারের অনেকগুলো কুকুর ছিল। তিনি সব ক’টি কুকুরকে নিয়ে যেতে চাইলেও এই কুকুরটি যায়নি। রয়ে গিয়েছিল বাড়ির মায়ায় আটকা পড়ে। কুকুরটির নাম ছিল বেঙ্গল টাইগার। তাঁরা যেখানেই যেতেন কুকুরটি সঙ্গে সঙ্গে যেত। কুকুরটির সঙ্গে তাঁদের একরকম বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। একদিন ভোরবেলা হুমায়ূন আহমেদ জমিদার বাড়ির মন্দিরের চাতালে বসে আছেন তাঁর সঙ্গে আছে ছোট বোন শেফালি ও ছোট ভাই জাফর ইকবাল। কিছুক্ষণ পর তাঁর মা তাঁদের সবার ছোট ভাই আহসান হাবীবকে বসিয়ে রেখে গেলেন, আর তাঁদের ওপর দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তাঁকে দেখে রাখার জন্য। মা চলে যাওয়ার পর দেখতে পেলেন একটা প্রকাণ্ড কেউটে দরজার ফাঁক থেকে বের হয়ে এসেছে। ফণা তুলে হিস হিস শব্দে সে আহসান হাবীবের দিকে এগিয়ে আসছে। ঠিক তখুনি বেঙ্গল টাইগার ঝাঁপিয়ে পড়ে সাপটির ফলা কামড়ে ছিঁড়ে ফেলে। সাপও তার মরণ ছোবল বসিয়ে দিয়ে যায় কুকুরের গায়ে। দু’দিন পর যখন বিষক্রিয়ায় কুকুরের শরীর পচে গলে যেতে থাকে তখন তাঁদের বাবা মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেবার জন্য কুকুরটিকে গুলি করে মেরে ফেলেন। এই ঘটনা হুমায়ূন আহমেদের মনে গভীর দাগ কাটে। এই কুকুরকে নিয়েই তিনি প্রথম কিছু লিখেছিলেন, নাম দিয়েছিলেন বেঙ্গল টাইগার (অথবা আমাদের বেঙ্গল টাইগার)। তারপর ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ রচনা করেন। তারপর তো সবই ইতিহাস। একে একে শঙ্খনীল কারাগার, রজনী, গৌরীপুর জংশন, অয়োময়, দূরে কোথাও, ফেরা, কোথাও কেউ নেই, আমার আছে জল, অচিনপুর, এইসব দিনরাত্রিসহ দুই শতাধিক উপন্যাসের জনক হুমায়ূন আহমেদ।
পেশাগত জীবনে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নশাস্ত্রের অধ্যাপক। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের মাঝে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। আর ঔপন্যাসিক হিসেবে তিনি এতটাই জনপ্রিয় যে শরত্চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পর বাংলা কথাসাহিত্যে এত জনপ্রিয়তা আর কারও মাঝে দেখা যায়নি। তিনি যেন গল্পের সেই পরশ পাথর—যেখানে হাত দিয়েছেন সেখানেই ফলেছে সোনা। কেবল অধ্যাপনা আর কথাসাহিত্যই নয়, তিনি যখন অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণে হাত দিলেন সেখানেও সাফল্যদেবী তাঁর মুঠোয় ধরা দিয়েছে। তাঁর নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক এই চলচ্চিত্রটি দেখতে প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ঢল নেমেছিল। মাসের পর মাস ধরে এই চলচ্চিত্রটি বক্স অফিস দখল করে রেখেছিল। শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিসেবে আটটি শাখায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছিল এই ছবিটি। তাঁর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক আরেকটি চলচ্চিত্র ‘শ্যামল ছায়া’ বিদেশি ভাষার ছবি ক্যাটাগরিতে অস্কার পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিল। তাঁর অন্য কীর্তি—শ্রাবণ মেঘের দিন, দুই দুয়ারী, চন্দ্রকথা প্রভৃতি চলচ্চিত্রগুলি কেবল সুধীজনের প্রশংসাই পায়নি, মধ্যবিত্ত দর্শকদেরও হলমুখি করেছে বহুদিন পর। টিভি নাট্যকার হিসেবেও তিনি সমান জনপ্রিয়। তাঁর প্রথম টিভি নাটক ‘এইসব দিনরাত্রি’ মধ্য আশির দশকে তাঁকে এনে দিয়েছিল তুমুল জনপ্রিয়তা। তাঁর হাসির নাটক ‘বহুব্রীহি’ এবং ঐতিহাসিক নাটক ‘অয়োময়’ বাংলা টিভি নাটকের ইতিহাসে একটি অনন্য সংযোজন। নাগরিক ধারাবাহিক ‘কোথাও কেউ নেই’-এর চরিত্র বাকের ভাই বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছিল টিভি দর্শকদের কাছে। নাটকের শেষে বাকের ভাইয়ের ফাঁসির রায় হলে ঢাকার রাজপথে বাকের ভাইয়ের মুক্তির দাবিতে মিছিল হয়েছিল। বাংলা নাটকের ইতিহাসে এমনটি আর হয়নি কখনো। এছাড়াও অসংখ্য বিটিভি ও প্যাকেজ নাটকের নির্মাতা তিনি। নাট্যকার-নির্দেশক দুই ভূমিকায়ই সমান সফল। সফল শিল্পের আরেকটি শাখা চিত্রকলাতেও। তাঁর চিত্রশিল্পের স্বাক্ষর নিজ বাড়ির দেয়ালে টাঙানো রয়েছে।
বালক হুমায়ূন আহমেদ যেমন ভালোবাসতেন গাছপালা শোভিত সবুজ অরণ্যানীর ভেতর ঘুরে বেড়াতে, বিটোভেনের সুরের মতন টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ শুনতে, তেমনি ষাটোর্ধ্ব হুমায়ূনেরও সবুজের ভেতর হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করত, ইচ্ছে করত আজও বৃষ্টির শব্দের ভেতর নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে। তাই তিনি গাজীপুরের শালবনের ভেতর তৈরি করেছিলেন এক বিশাল নন্দন কানন নুহাশ পল্লী। তিনি বেশির ভাগ সময়ই কাটাতেন নুহাশ পল্লীর শাল গজারির সঙ্গে কথা বলে, বৃষ্টির শব্দের সঙ্গে মিতালি করে।
বিংশ শতাব্দীর বাঙালি জনপ্রিয় ঔপন্যাসিকদের তিনি অন্যতম। তিনি একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার এবং নাট্যকার। বলা চলে যে বাংলা সায়েন্স ফিকশনের তিনি পথিকৃত্। নাটক ও চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবেও তিনি সমাদৃত। তাঁর বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশকিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও তিনি নাটক ও চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে অনেক জনপ্রিয় গান রচনা করেছেন।
হুমায়ূন আহমেদ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য—বাংলা একাডেমি পুরস্কার ১৯৮১, শিশু একাডেমী পুরস্কার, একুশে পদক ১৯৯৪, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (শ্রেষ্ঠ কাহিনি ১৯৯৩, শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ১৯৯৪, শ্রেষ্ঠ সংলাপ ১৯৯৪), লেখক শিবির পুরস্কার (১৯৭৩), মাইকেল মধুসূদন পদক (১৯৮৭), বাকশাস পুরস্কার (১৯৮৮), হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক ইত্যাদি।
বাংলা কথাসাহিত্যের এই উজ্জ্বল নক্ষত্র ২০১২ সালের ১৯ জুলাই ক্যানসার আক্রান্ত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের
বেলভ্যু হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন।
