আলাউদ্দিন চৌধুরী
ব্যাপকহারে কমে যাচ্ছে দেশের হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা। সেইসাথে কমেছে তাঁতির সংখ্যাও। তারা প্রযুক্তির কল্যাণে চলে যাচ্ছে অন্য পেশায়। দেশে শিল্পের প্রসার ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে এই কুটির শিল্প। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে এমন চিত্র উঠে এসেছে। সম্প্রতি করা তাঁত শুমারির প্রতিবেদনে এমন চিত্র উঠে এসেছে। শুমারির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে মোট ২ লাখ ১২ হাজার ৪২১টি তাঁত ছিল, যা ২০০৩ সালে হ্রাস পেয়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫১২টি হয়েছে। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী ২০১৮ সালে এই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ লাখ ১৬ হাজারে। অর্থাত্ ১৯৯০ সালের তুলনায় দেশে হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা কমে গেছে ৪৫ দশমিক ৩৯ ভাগ।
সুদূর অতীতে দেশের কৃষিখাতের পরই গ্রামীণ অর্থনীতিতে তাঁত শিল্পে সবচেয়ে বেশি কর্মসংস্থান ছিল। ভারতীয় উপমহাদেশসহ ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের মসলিন, জামদানি, বেনারসির চাহিদা ছিল, যা মূলত এই হস্তচালিত তাঁতেই তৈরি হতো। পরবর্তীতে শিল্পবিপ্লব এবং আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের ফলে হস্তচালিত তাঁতের চাহিদা কমে আসে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর শুমারিতে এই শিল্প ছোট হয়ে আসার আরো কারণ উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, কালের বিবর্তনে পাওয়ার লুম বা কলের তাঁত ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে। এই খাতে বড় বড় শিল্পায়ন হচ্ছে। ফলে হস্তচালিত তাঁতিরা পিছিয়ে পড়েছে। হস্তচালিত তাঁত এখন আর বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। শতকারা ৯৯ ভাগ হস্তচালিত তাঁত পারিবারিকভাবে উত্পাদন কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাছাড়া এই শিল্পে মূলধনের অপর্যাপ্ততা ও বাজারজাত করার সমস্যা রয়েই গেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন প্রজন্মের মাঝে হস্তচালিত তাঁতকে পেশা হিসেবে নেওয়াটা নিরুত্সাহিত হচ্ছে। ফলে এই পেশায় দক্ষ জনবলের অভাবও রয়েছে। ১৯৯০ সালে ৫৫ ভাগ পুরুষ এই শিল্পে থাকলেও ২০১৮ সালে এই হার ৪৪ ভাগে নেমে এসেছে। অবশ্য নারীর অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যহারে বেড়েছে। ৪৪ ভাগ থেকে ৫৭ ভাগে উন্নীত হয়েছে নারীদের অংশগ্রহণ। দেশে অর্ধেকের বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে। ভৌগোলিক পরিবেশ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে সীমাবদ্ধতায় তারা এ শিল্প টিকিয়ে রেখেছে। বিবিএস সূত্র জানায়, দেশে বাগেরহাট, ভোলা, চাঁদপুর ও লক্ষ্মীপুর জেলায় তাঁত বা তাঁতি পাওয়া যায়নি।
তাঁত শুমারির প্রকল্প পরিচালক মহিউদ্দিন আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, এবারের শুমারিটি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির। শুমারিতে তাঁতিদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার চিত্র তুলে আনা হয়েছে। শুমারির প্রাথমিক ফল তৈরি করা হয়েছে। শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে।
বিবিএস সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালে সর্বশেষ তাঁত শুমারি অনুযায়ী দেশে তাঁত শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষভাবে দেশের প্রায় ১৩ লাখ ২৭ হাজার নারী-পুরুষ কর্মরত ছিল। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা কমে এসেছে ৩ লাখে। শুমারি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কুটির শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে হস্তচালিত তাঁতের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে তাদের জন্য ভিন্ন বাজার তৈরি করতে হবে। দক্ষ শ্রমিকদের ধরা সম্ভব না হলে ক্রমেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে এই শিল্প। এজন্য নীতি নির্ধারকদের পরিকল্পনা প্রণয়নে এই শুমারির ফল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কোথায় কত তাঁত :প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী দেশে সংখায় সবচেয়ে বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে রাঙ্গামাটিতে ২৯ হাজার ২২৪টি বা ২৫ দশমিক ১৯ শতাংশ। এই অঞ্চলের পরেই খাগড়াছড়িতে ১৮ হাজার ১১৬টি (১৫.৬২%), বান্দরবানে ১৬ হাজার ৮৩০টি (১৪.৫১%) তাঁত রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলের বাইরে দেশে সবচেয়ে বেশি হস্তচালিত তাঁত রয়েছে কুষ্টিয়ায় ১০ হাজার ৬৫৬টি (৯.১৯%), এর পরে সিরাজগঞ্জে ৯৭৬৬টি (৮.৪২%)। সিরাজগঞ্জ জেলাতে ২২৫টি কারখানা পাওয়া গেছে যেখানে বাণিজ্যিকভিত্তিতে হস্তচালিত তাঁত ব্যবহার হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জে রয়েছে ৩৯৪৪টি তাঁত, বগুড়ায় ৩৩৭৫টি, টাঙ্গাইলে ৩২৯০টি, পাবনা ২৮৩৩টি, মৌলভীবাজার ২৪৯১টি, ঝিনাইদহে ১৮৯৯টি, ঢাকায় ১৩৮১, রাজবাড়িতে ১২৫৭টি এবং নরসিংদীতে রয়েছে ১১২৮টি তাঁত। এরমধ্যে টাঙ্গাইলে ২৪৭টি ও নরসিংদীদে ২৫টি শিল্পে হস্তচালিত তাঁত ব্যবহার হচ্ছে।
