স্বামীকে বাঘে খেলে ঘর ছাড়া হতে হয় স্ত্রীকে

আপডেট : ৩০ জুলাই ২০১৭, ১৮:০০
অনেকটা সতিদাহ প্রথার মতো বাঘের আক্রমণে স্বামী নিহত হলে তার দায়ভার গ্রহণ করা লাগে স্ত্রীর। তার আর ঠাই হয় না স্বামীর সংসারে। সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষেরা এ রকম নানা কুসংস্কার পালন করে থাকে। এসব কুসংস্কারের কারণে বাঘের আক্রমণে স্বামী নিহত হলে সেই দায় গিয়ে পড়ে নিহতের স্ত্রীর ওপর।
 
সুন্দরবন সংলগ্ন মুন্সিগঞ্জ জেলে পাড়ার এক আলোচিত মুখ সোনামনি। তার দুই স্বামীকে বাঘে খেয়েছে। এ জন্য কোন শুভ কাজে যাওয়ার আগে তার মুখ দেখে কেউ বের হয় না।
 
সোনামনি বলেন, ‘১৯৯৯ সালে আমার স্বামীকে বাঘে ধরে সেজন্য আমার শাশুড়ি আমাকে ১ মাস বয়সী বাচ্চাসহ তাড়িয়ে দেয়। আমি সেই বাচ্চাকে নিয়ে পথে পথে ঘুরে বেড়াতাম। আমার কষ্ট দেখে আমার স্বামীর ছোট ভাই আমাকে বিয়ে করে। ২০০৩ তাকেও বাঘে ধরে। এর পর থেকে আমাকে সব শুনতে হয় অপয়া-অলক্ষ্মী-স্বামী খেগোসহ নানা কথা। কোন সামাজিক অনুষ্ঠানে আমাকে দাওয়াত দেয়া হয় না। দাওয়াত দিলেও সবার শেষে খেতে দেয়া হয় আমাকে।’
 
শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জ এলাকার ‘বাঘ বিধবা’ বুলি দাশী বলেন, ‘আমার স্বামী অরুণ মণ্ডল ২০০২ সালে সুন্দরবনে মাছ ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমনে নিহত হয়। এর পর থেকে আমার শাশুড়ি আমাকে বলতে থাকে তুই অপায়া, তোর কারণে আমার ছেলেকে বাঘে খেয়েছে এই বলে আমাকে নির্যাতন করতো। এ  ঘটনার দুইমাসের মাথায় তিন ছেলে-মেয়েসহ আমার শ্বাশুড়ি আমাকে তাড়িয়ে দেয়। যখন আমাকে তাড়িয়ে দেয় তখন আমার ছোট মেয়ের বয়স মাত্র এক মাস।’
 
তিনি আরো বলেন, আমাদের গ্রামের অনেকেরই স্বামীকে বাঘে খেয়েছে। তাদের অলক্ষ্মী, অপয়া বলে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। আমার স্বামীর ছোট ভাইও বাঘের আক্রমণে নিহত হয়। তার স্ত্রী দিপালিকেও বাপের বাড়ি তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
 
জানা গেছে, বাঘের আক্রমণে সেসব নারীদের স্বামী হারা হয় গণমাধ্যমে তাদের ‘বাঘ বিধবা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তাদের অনেক সময় সামাজিক কুসংস্কারের কারণে অপায়া, অলক্ষ্মী, স্বামী খেগো-অপবাদ দিয়ে স্বামীর ভিটা থেকে বিতাড়িত করা হয়। স্বামীর সংসারে তাদের আর ঠাই মেলেনা।
 
সুন্দরবন বিশেষজ্ঞ পিষূস বাউলিয়া পিন্টু বলেন, সুন্দরবনে প্রবেশের আগে বনজীবীরা ‘বনবিবি’র’ পূজা অর্চনা দিয়ে বনে প্রবেশ করে। সুন্দরবনে উপর নির্ভরশীল মানুষের মধ্যে আদিকাল থেকে কিছু কুসংস্কার চলে আসছে। কারো স্বামীর বনে মধু সংগ্রহ, কাট কাটা, মাছ ধরা জন্য প্রবেশ করলে সেই নারীকে কিছু নিয়ম মানতে হয়। যেমন অন্য পরুষের সঙ্গে কথা বলা যাবে না, চুল আচড়ানো যাবে না, শরীরে তেল মাখা যাবে না। এ ধরনের অনেকগুলো কুসংস্কার তাদের মানতে বাধ্য করা হয়। সরকারি-বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সচেতনার মাধ্যমে সেটা থেকে অনেকটা বের হয়ে আসা গেছে। তার পরও সুন্দরবনের উপর নির্ভরশীল অনেক পরিবার এটি ধরে রেখেছে।
 
মুন্সিগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. আবুল কাশেম মোড়ল বলেন, সুন্দরবনের কোল ঘেষা মানুষ আমরা। আমাদের এলাকার মানুষের শিক্ষার হার অনেক কম। তবে এখন অনেকটা উন্নত হয়েছে। এই অঞ্চলের মানুষের মাঝে কিছু কুসংস্কার ছিল কারো স্বামীকে বাঘে ধরলে পুরো দোষটা স্ত্রীকে দিয়ে তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হতো। মানুষ এখন অনেক সচেতন এখন আর এটি শোনা যায় না।
 
তিনি আরো বলেন, প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগের কারণে সুন্দরবন প্রাকৃতিক ভারসাম্য বদলে যাওয়ায় সুন্দরবনের বাঘের জীবন বিপন্ন হয়ে পড়েছে। সুন্দরবন বাঘের সংখ্যা কমে যাওয়ায় এখন বাঘের আক্রমণে নিহতের ঘটনা খুবই কম শোনা যায়। এই বছর তিনজন বাঘের আক্রমণে নিহত হয়েছে বলে জেনেছি।
 
শ্যামনগর উপজেলার নির্বাহী অফিসার কামরুজ্জামান জানান, স্থানীয়দের কাছে জেনেছি সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষদের শিক্ষার হার কম হওয়ায় এরা কুংস্কারে বিশ্বাসী। তবে এটা থেকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করছি। দুই এক বছররের মধ্যে শূন্যের কোঠায় আনা হবে।
 
ইত্তেফাক/ইউবি