ফেসবুকে রাবি শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি, জিডি

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ০১:১২

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কয়েকটি ফেসবুক পেজের মাধ্যমে নারী শিক্ষার্থীদের ছবিসহ বিভিন্ন পোস্টের মাধ্যমে যৌন হয়রানি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। শুক্রবার সকালে এ ঘটনায় রাজশাহীর মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন ভুক্তভোগী এক শিক্ষার্থী। তবে কে বা কারা এই পেজের অ্যাডমিন এ বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।

জানা গেছে, গত বুধবার রাতে ‘Ru Crush & Hate Confession’  নামের ফেসবুক পেজে রাবির এক ছাত্রীর ছবিসহ দেয়া একটি পোস্টে তার সম্পর্কে অশ্লীল, অশ্রাব্য, কুরুচিপূর্ণ এবং যৌন হয়রানিমূলক তথ্য প্রকাশ করা হয়। মূহুর্তেই পোস্টটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত সাড়ে পাঁচ হাজার শিক্ষার্থী দেখেন। সেখানে কমেন্টের স্থলেও শুরু হয় ‘বিদ্বেষমূলক’ মন্তব্য। কেউ কেউ স্ক্রিন শর্ট নিয়ে তাতে আরও ‘বিদ্বেষমূলক’ মন্তব্য জুড়ে দিয়ে শেয়ার করতে থাকেন ফেসবুকে। রাতভর সামাজিক মাধ্যমে ওই ছাত্রীকে নিয়ে চলে নেতিবাচক আলোচনা, সমালোচনা ও ‘হয়রানিমূলক মন্তব্য’। 

পরদিন গত বৃহস্পতিবার বিভিন্ন জনের আপত্তির মুখে পোস্টটি সরিয়ে ফেলেন পেজের অ্যাডমিন। এদিকে বৃহস্পতিবার রাতেও ওই পেজটা দেখা গেলেও শুক্রবার বিকালে ফেসবুকে সার্চ করে আর পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রী বলেন, কিছুদিন ধরে এক বন্ধু আমার সঙ্গে সম্পর্ক করার জন্য চেষ্টা করছিল। তবে তার সঙ্গে বন্ধুত্ব থাকলেও রিলেশনে জড়ানোর মতো ইচ্ছে ছিল না। তবে বিভিন্নভাবে সে আমাকে বিরক্ত করতো। এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে তার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করলে সে আমাকে দেখে নেওয়ার হুমকি দেয়। এর কয়দিন পরই এমন পোস্ট করে আমার সম্মান নষ্টের চেষ্টা করা হয়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ওই ছাত্রী বলেন, আমি খুব মানসিক চাপে আছি। আমার বাবা-মা বা এলাকার কোনো মানুষ যদি পোস্টটি দেখে থাকে, তবে তাদেরকে আমি কি বলে আশস্ত করবো? তাদের বিশ্বাস করানো কঠিন হবে; যে এমন কোনো কাজে আমি যুক্ত নই।
 
ভুক্তভোগী ছাত্রী আরও জানান, পোস্টটি দেখার পরপরই পেজের ম্যাসেজ অপশনে গিয়ে পোস্টটি ডিলিট করার জন্য অনুরোধ করলে তারা হাস্যরসাত্মক রিপ্লাই দিতে থাকে। আইনের আশ্রয় নেওয়ার কথা বললে তাদের কথা বলার সময় নেই এবং যা মন চায় করার কথা বলে। এছাড়া এমন পোস্টেও কারণ জানতে চাইলে প্রতিউত্তরে তারা জানায়, ‘এতে আমাদের কোনো দায় নেই! যে, যা দেই; আমরা তা পাবলিশ করি।’

জানতে চাইলে রাবি ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়লা আরজুমান বানু বলেন, ‘রাবিতে এমন পেজ আছে সেই সম্পর্কে আমার জানা ছিলো না। কেউ এ বিষয়ে অভিযোগও করেনি। তবে খতিয়ে দেখা হবে।’ তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান পোস্টটির স্ক্রিন-শর্ট দেখে চরম ক্ষুব্ধ হন এবং জোর দিয়ে বলেন, ‘এ ব্যাপারে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এদিকে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এর আগেও এসব ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে প্রক্টর, ছাত্র উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সংগঠন। এর মধ্যে অন্যতম রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ল’ ফাইন্ডার্স অ্যাসোসিয়েশন (রুয়ালফ)। তবে এতে কোনো ফায়দা হয়নি।

এর আগেও দেখা গেছে, পেজগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকেনো ছাত্র-ছাত্রীর ছবিসহ তার সম্পর্কে তথ্য বা তাকে ভালো লাগার কারণ বা প্রেম করতে চাওয়ার অভিপ্রায় প্রকাশ করা হয়। যে কেউ ফেক আইডি ব্যবহার করে ছবিসহ তথ্য সরবরাহ করলেই মূহুর্তেই তা প্রকাশ করা হয়। যা পৌঁছে যায় ফলোয়ারদের নিউজফিডে। এমন ইংরেজি অক্ষরে ‘আরইউ ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশন’, ‘ক্রাশ অ্যান্ড কনফেশনস আরইউ’, ‘আরইউ ক্রাশ এ্যান্ড হেটস কনফেশনস’সহ অন্তত ৮/১০টি পেজের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে দু’টি পেজে ২০ সহস্রাধিক ফলোয়ার।

এর আগে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের একজন বিবাহিত ছাত্রীর সম্পর্কে পেজে পোস্ট দেওয়া হয়। চাকরি সূত্রে খুলনায় অবস্থান করা তার স্বামীর কাছে পৌছে যায় ওই পোস্টটি। সেখান থেকে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শুরু হয় পারিবারিক কলহ। যা তিনমাস পর বিবাহ বিচ্ছেদে রূপ নেয়। ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রেও ঘটেছে এমন ঘটনা। এই পেজগুলো বন্ধ করা বা এদের কার্যক্রম নজরদারি করার কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।

জানতে চাইলে মতিহার থানার অফিসার ইনচার্জ হোসেন বলেন, ‘আজ (শুকবার) সকালে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্ত চলছে, খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইত্তেফাক/আরকেজি