কর্ণফুলী নদীতে ক্যাপিটাল ড্রেজিং প্রকল্পের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মালয়েশিয়ান মেরিটাইম ড্রেজিং করপোরেশনের (এমএমডিসি) সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি বাতিল অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এ চুক্তি বাতিল করে।
দীর্ঘ শুনানির পর গতকাল শনিবার আরবিটেইশন ট্রাইব্যুনাল তাদের রায়ে বলেছে, বন্দর কর্তৃপক্ষের ওই চুক্তি বাতিল আইনসঙ্গত হয়নি, এটি অবৈধ ছিল। ট্রাইব্যুনালের তিন বিচারকের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি রুহুল আমীন এবং বিচারপতি সৈয়দ আমিরুল ইসলাম ঠিকাদার বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ বলে রায় দেন। অপর বিচারপতি শাহ আবু নাঈম মুমিনুর রহমান ঠিকাদার বাতিল আইনসম্মত হয়েছে বলে রায় দেন। ট্রাইব্যুনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক গ্যারান্টির ২২ কোটি ৯৫ লাখ ৪৩ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এমএমডিসি’র দাবিকৃত অর্থ ৬০ দিনের মধ্যে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছে।
২০১১ সালে এমএমডিসি চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী নদীর সদরঘাট থেকে উজানে প্রায় সোয়া দুই কিলোমিটার এলাকায় খননকাজের জন্য নিয়োগ পায়। সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে প্রায় ২২৯ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ পায় এমএমডিসি। এ প্রকল্পের অধীনে আরো ছিল কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাড়ে বাঁধ এবং প্রায় ৪০০ মিটার জেটি নির্মাণ। এছাড়া নদীর পাশে ওয়াকওয়ে নির্মাণ করারও কথা ছিল ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের।
২০১১ সালের ৫ জুলাই প্রকল্পের কাজ শুরু করে এমএমডিসি। ২০ মাসের মধ্যে নির্ধারিত কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের প্রথম থেকেই বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি হয়। যার ফলে পরপর তিনজন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন করতে হয়।
খননকাজ যে এলাকায় চলবে তা বুঝিয়ে দেয়ার বিষয়ে, ওই এলাকায় নদীতে ও তীরে থাকা বিভিন্ন সরকারি ও করপোরেশনের অবকাঠামো এবং সরঞ্জামাদি সরিয়ে নিতে সৃষ্টি হয় দীর্ঘসূত্রতা। বন্দর কর্তৃপক্ষ এ সব কাজ দ্রুত শেষ করে না দেয়ায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি অভিযোগ তোলে। আবার খনন করে তোলা প্রায় ৩৬ লাখ ঘন মিটার বালু ও মাটি কোথায় ফেলা হবে এবং মালিকানা নিয়ে স্থায়ী রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের সঙ্গে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়।
অন্যদিকে সর্বশেষ পর্যায়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানটি দাবি করে, বুয়েট কর্তৃক সিডিউলে নদীতে পলি জমার যে মাত্রা ধরা হয়েছিল তা থেকে অনেক বেশি পলি নদীতে জমছে। আবার নগরীর সকল বর্জ্য নদীতে পড়ায় পলি জমার মাত্রা শতকরা ৫০ ভাগে উন্নীত হয় বলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান দাবি করে। অবশ্য বুয়েটের তৈরিকৃত সিডিউল অনুযায়ী পলি জমার মাত্রা শতকরা ৭ ভাগ। ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান অতিরিক্ত পলি জমার জন্য অতিরিক্ত চার্জ দাবিসহ কতিপয় দাবির প্রেক্ষিতে বন্দরের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বেড়ে যায়। এর এক পর্যায়ে ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে। চুক্তি বাতিলের বিরুদ্ধে এমএমডিসি হাইকোর্টে মামলা করলে আদালত চুক্তি অনুযায়ী আর্বিট্রেইশনাল ট্রাইব্যুনালে এর নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। এর প্রেক্ষিতে তিন সদস্যের আরবিট্রেইশন ট্রাইব্যুনাল গঠন হয়। ট্রাইব্যুনাল দীর্ঘদিন শুনানির পর গতকাল এ রায় প্রদান করে।
রায়ের ব্যাপারে চট্টগ্রাম বন্দরের আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজিব উল আলম জানান, পুরো রায় পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তের আলোকে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তবে বন্দরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, তারা বিভক্ত রায়ের প্রেক্ষিতে হাইকোর্টে যাবেন।
অন্যদিকে এমএমডিসি’র প্রতিনিধি আলতাফ হোসেন জানান, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত অবৈধ ঘোষণা করায় এ পর্যন্ত তাদের যে বিশাল অংকের ক্ষতি হয়েছে তা প্রদানের জন্য বন্দরকে পত্র দিবেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বন্দর তাদের বিপুল পরিমাণ সরঞ্জামাদি আটকে রেখেছে। যা ইতিমধ্যে অকেজো হয়ে গেছে। তাছাড়া বন্দর আগের অনেক বিলও প্রদান করেনি। তিনি জানান, তারা বন্দর থেকে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা নিয়েছে। কিন্তু এর চেয়ে বেশি কাজ তারা করেছে।
এদিকে কর্ণফুলী নদীতে ক্রমাগত পলি জমায় প্রকল্পের এলাকায় বিশাল চর পড়েছে। এ অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দর ইতিমধ্যে ২৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নৌ বাহিনীর মাধ্যমে কর্ণফুলী নদী ড্রেজিং প্রকল্প গ্রহণ করেছে। নৌ বাহিনী কাজ শুরু করেছে।
ইত্তেফাক/নূহু
