‘বাবা আমাদের দিকে কেউ দেখে না। আমরা গরিব তাই নেতারা শুধু ভোটের সময় আসে। তারপর আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। পৌরসভার মধ্যে বাস করি। কিন্তু বাড়িতে ঢোকার রাস্তা নেই। সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠানে পানি জমে যায়। বৃষ্টি একটু বেশি হলেই ঘরের মধ্যে পানি উঠে যায়। অথচ একটা ড্রেন নেই পানি বের হওয়ার। আমরা কনে যাবো বাবা? আদিবাসী বলে কি আমরা মানুষ না ? ’ বয়স সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকলেও দেখেই বোঝা যায় শত বছরের কম হবে না এ এলাকার বাসিন্দা পুস্প কর্মকারের। বাঁচার করুণ আকুতি জানিয়ে এভাবেই ক্ষীণকণ্ঠে আর্তনাদ করেন পুস্প। চোখে দেখেন না, কানেও কম শোনেন, রোগে-শোকে জীবন চলে না।
মাগুরা শহরের শিবরামপুর সরদারপাড়া এলাকায় বসবাস আদিবাসী এ বৃদ্ধার। ভাঙা স্যাঁতসেঁতে কুড়েঘর, ড্রেনের অভাবে উঠানে সব সময়ই পানি বেঁধে থাকে, টাকার অভাবে চিকিত্সা করাতে পারছেন না। এমনকি দুই বেলা ঠিকমত খাবারও জোটে না। সরকারের পক্ষ থেকে আদিবাসী তেমন কোনো সহযোগিতা না পেয়েও একটু ভালো থাকার আশায় যাকেই সামনে পান তার কাছেই এ ধরনের আকুতি জানান পুস্প। নাগরিক অধিকার বঞ্চিত এমন অনেক পুস্পর খোঁজ পাওয়া যায় মাগুরার কয়েকটি আদিবাসী পল্লীতে। একইভাবে তাদের নানা দুঃখ-বঞ্চনার কথা জানালেন ওই এলাকার বাসিন্দা পদ্ম কর্মকার, পূর্ণিমা, মুক্তি সরকার, কিশোর সরকারসহ একাধিক আদিবাসী।
এমনি পরিস্থিতিতে নানা আয়োজনে আজ সারা বিশ্বের মত মাগুরায় পালিত হবে বিশ্ব আদিবাসী দিবস। ১৯৯৪ সাল থেকে আদিবাসীদের অধিকার সংরক্ষণে এই দিবসটি পালন করে আসছে জাতিসংঘ। মাগুরায়ও ওইদিন সকালে আয়োজন করা হয়েছে মানববন্ধন ও আলোচনা সভার।
দীর্ঘ বছর ধরে মাগুরার বিভিন্ন এলাকায় ছয়টি গোষ্ঠীর প্রায় ১৬ হাজার আদিবাসী বসবাস করে আসছেন। মূলত কৃষি শ্রমিক ও দিনমজুর এ আদিবাসী সম্প্রদায় আজো পর্যন্ত কোনো নাগরিক অধিকার বুঝে পাননি। যুগ যুগ ধরে তাদের জীবনে আসেনি কোনো পরিবর্তনের হাওয়া।
মাগুরা আদি বানিয়াজ সমাজ কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক সুবোধ বাগদি জানান, সরকারি হিসেবে দেশে মোট ৪৫ লাখ আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। এর মধ্যে সমতলে বসবাস করে ৩৫ লাখ জনগোষ্ঠী। অথচ সরকারের বাজেট বরাদ্দের অধিকাংশই খরচ হয় পাহাড়ে বসবাসকারীদের জন্য। সমতলের আদিবাসীরা বরাবরই রয়ে গেছেন সকল সুযোগ-সুবিধার বাইরে।
মাগুরা আদি যুব সমাজ কল্যাণ সমিতির সভাপতি হিরালাল কর্মকার জানান, মাগুরার আদিবাসী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন এলাকায় ২৯টি গ্রামে বুনা, বাগদী, ঘাসি, ভূমিজ, মালি ও লৌহ কর্মকারসহ ছয়টি আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাস। এখানকার অধিকাংশ আদিবাসীই ভূমিহীন। আদিবাসী পল্লীগুলোতে প্রয়োজনীয় সেনিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা না থাকায় আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ নিয়মিত বিভিন্ন রোগে ভোগেন। এছাড়া অশিক্ষা ও বাল্য বিবাহ এখানকার অন্যতম প্রধান সমস্যা। মাগুরার আদিবাসীরা সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত।
মাগুরা পৌরসভার প্রধান প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম হিরক জানান, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ইউজিএফ-৩ প্রোজেক্টের মাধ্যমে আসন্ন কর্মসূচিতে মাগুরার বস্তিবাসী ও আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হলে আদিবাসী পল্লীগুলোতে স্যানিটেশন, আবাসন ও শিক্ষা বিস্তার লাভ করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
ইত্তেফাক/নূহু
