মুর্তজা বশীরের আত্মসচেতনতার মূলে আছে আত্মপ্রত্যয়

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৭, ০১:১৪

মুর্তজা বশীরকে আত্মসচেতন বলে মনে হবে। এই আত্মসচেতনতার মূলে আছে আত্মপ্রত্যয়। সেই আত্মপ্রত্যয় না থাকলে তিনি আজ যেখানে এসে পৌঁছেছেন, সেখানে পৌঁছতে পারতেন না। বন্ধু মুর্তজা বশীরের ৮৫তম জন্মদিনে গতকাল এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত ‘মুর্তজা বশীর: মানুষ ও শিল্পী’ শীর্ষক আমিনা বশীর স্মৃতি বক্তৃতায় প্রফেসর ইমেরিটাস আনিসুজ্জামান এসব কথা বলেন।

একজন শিল্পী তার কর্মের পরিধিকে যে কত নতুন মাত্রায় নিয়ে যেতে পারেন তার এক বিস্ময়কর উদাহরণ শিল্পী মুর্তজা বশীর। কিন্তু তার কাজ নিয়ে কখনো খুব নিরাসক্ত বলে মনে হয়। আবার এক কাজ করতে করতে সেদিকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। ছবি আঁকার পাশাপাশি লিখেছেন উপন্যাস, কবিতা, ছোটগল্প। সেসব লেখালেখিও বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বলতম সংযোজন। এই বর্ণাঢ্য চরিত্র যেন ভিন্ন এক আলোয় উদ্ভাসিত হলো অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের দৃষ্টিতে। সেই দৃষ্টি কখনো তির্যক, সমালোচনায় তপ্ত এবং প্রশংসায় সিক্ত।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, আমাদের দেশের অনেক শিল্পীর মতো তার মধ্যেও একটা দোলাচল আছে। শিল্পীমাত্রেরই মনোজগতের রূপ ও রং বদলায়, বশীরের ক্ষেত্রেও তা ঘটেছে। শিল্পী ১৯৬৭ সাল থেকে মহিলাদের যেসব ছবি এঁকেছেন, তবে কেবল বিক্রির জন্য। রমণীদের ছবি এঁকে তিনি কখনই তৃপ্তি পাননি। কিন্তু অতৃপ্তি? সে কি শিল্পীমাত্রই যে-অতৃপ্তিবোধ ক্রমাগত তাদের সৃজনশীলতাকে উসকে দেয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি আমিরুল ইসলাম চৌধুরী, সহ-সভাপতি অধ্যাপক শরীফ উদ্দিন আহমেদ, সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ড. সাব্বির আহমেদ। এসময় আরো বক্তব্য রাখেন শিল্পী মুর্তজা বশীর ও তার মেয়ে মুনিজা বশীর। পরে সবাই মিলে কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেন। লিখিত বক্তৃতা পাঠ করেন অধ্যাপক আনিসুজ্জামান।

মুর্তজা বশীরের শিল্পী জীবনে সূচনা পর্ব তুলে ধরে আনিসুজ্জামান বলেন, গোড়ায় বশীরকে দেখি লিনোকাট ও উডকাট করতে। তারপর কিছুকাল জলরঙ। তারপরে যে তৈলচিত্রের দিকে ঝুঁকলেন, বলা যায় এখনো তাতে স্থিত আছেন। এচিং, অ্যাকুয়াটিন্ট ও লিথোগ্রাফ করেছেন তিনি। মোজেক ও ম্যুরালও তার প্রিয় মাধ্যম। তবে তিনি ঘুরে ফিরে এসেছেন রৈখিক ড্রইংয়ে। তার ড্রইং অত্যন্ত শক্তিশালী। ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত বশীর গণ্য হতো এদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ ফিগারেটিভ চিত্রকর হিসেবে।’

চিত্রকর্ম ছাড়াও শিল্পী বশীর লেখক ও শখের বিভিন্ন বিষয়ও তুলে ধরেন আনিসুজ্জামান। তিনি বলেন ‘সাহিত্যক্ষেত্রে বশীর আমাদের দিয়েছেন একটি গল্পসংগ্রহ, দুইটি উপন্যাস ও পাঁচটি কাব্যগ্রন্থ। ছোটগল্পে বশীর অনেক সংহতির স্বাক্ষর রেখেছেন।’ তার শখ সম্পর্কে তিনি বলেন ‘অল্পবয়স থেকে ডাক টিকিট ও মুদ্রা জমানো ছিল তার বিশেষ শখ। এখনো আছে। তিনি যে একজন মুদ্রাবিশারদ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবেন, তা ছিল কল্পনার অতীত। গবেষণার বিষয় হিসেবে বশীর বেছে নিয়েছেন বাংলায় মুসলিম শাসনকালের মুদ্রা। তিনি খুঁজের বের করতে চেয়েছেন বাংলার ইতিহাসের কিছু হারানো অধ্যায়।

আনিসুজ্জামান বলেন ‘সংসারী হয়েও জীবনের আকর্ষণ বশীর হারিয়ে ফেলেননি। অনেক তাকে সংসার উদাসীন মনে হয়েছে। আবার ছেয়েমেয়ের কল্যাণের বিষয়ে তার তীক্ষ দৃষ্টি। তাদের অসুখ হলে বশীর খুবই বিচলিত হতেন। স্ত্রীর অসুখেও তাকে বিচলিত হতে দেখেছি। স্ত্রীর জীবনেরও শেষ দিনগুলোতে বশীর যেভাবে হাসপাতালে তার পাশে থেকেছেন, তা খুব কম লোকেরই সাধ্য হবে।’ জন্মদিনে মুর্তজা বশীর বলেন, আমি ছবি আঁকি কিন্তু আশেপাশের দেশে কী ঘটছে তা জানি না। তেমনি এখানে আমার জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে কিন্তু স্ত্রীকে নিয়ে কোন কথা হয়নি। এই বক্তৃতা অনুষ্ঠান আমার স্ত্রী আমিনা খাতুনের নামে। তাই তাকে নিয়ে কিছু বললে আমার ভাল লাগতো। অনুষ্ঠানে মাকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন মেয়ে মুনিজা বশীর।

ইত্তেফাক/নূহু