জামালপুর জেলায় একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অভাবে প্রতিবছর বার-বার বন্যা দেখা দেয়। বন্যায় লাখ-লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আশ্রয় নিয়ে শিশুকিশোর, বৃদ্ধদের নিয়ে অমানবিক কষ্ট-যন্ত্রণা ভোগ করছে। এছাড়া বন্যার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি পুষিয়ে নিতে ঋণগ্রস্ত হয়ে দিন-দিন তাদের দরিদ্রতার দিকে ধাবিত হতে হচ্ছে। এ বছর দুই দফা বন্যায় জেলার যমুনা নদীর তীরবর্তী ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ি উপজেলার কমপক্ষে পাঁচ লক্ষাধিক মানুষদের ঘরবাড়ি, জমির ফসলসহ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
প্রথম দফা বন্যার পর মানুষ ঘরে ফিরতে না ফিরতেই দ্বিতীয় দফা বন্যায় শুধু ইসলামপুর উপজেলা দুর্যোগ ও ত্রাণ শাখা তথ্য অনুযায়ী ১৬০টি গ্রামের ২৯ হাজার ৩৪০টি পরিবারের এক লাখ ৪৬ হাজার ৭০০ জন মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। প্রতি পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল প্রতিদিনে প্রয়োজন ২৯৩ মেট্রিক টন, দুই কেজি করে শুকনা খাবার চিড়া ৫৮ মেট্রিক টন এবং ২৯ মেট্রিক টন গুড় এবং সাড়ে ২৯ হাজার প্যাকেট মোমবাতি ও ম্যাচ প্রয়োজন। সেখানে সরকারিভাবে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ মেট্রিক টন চাল এবং ২০/২৫ হাজার টাকা। যা ত্রাণ বিতরণে বহন খরচ করতে হয়। এছাড়া ইসলামপুর উপজেলায় ২১০টি আধাপাকা বাড়ি-ঘর নিশ্চিহ্ন হয়েছে এবং ৯২৫টি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিনাডুলী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুস ছালাম, পার্থশীর ইউপির চেয়ারম্যান, ইফতেখার আলম বাবুল, কুলকান্দির চেয়ারম্যান সনেট বলেন, এর চেয়েও আরো অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে তারা জানিয়েছেন। বেসরকারি হিসাবে প্রায় এর তিন গুণেরও বেশি। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাকিরা দেড় শতাধিক ব্রিজ-কালভার্ট, উঁচুস্থানসহ বিভিন্ন রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়ে গবাদিপশু আর মানুষ একসঙ্গে বাস করছে। এসব মানুষ প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী, বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো-খাদ্যের অভাবে মানবেতর জীবন যাপন করছে।
দেলিরপাড় ব্রিজের ওপর আশ্রিত কৃষক মুকুল জানান, আমরা এখানে ২০-২৫টি পরিবার গরু-বাছুর-ছাগল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছি। রান্না করার জায়গা না থাকায় আমরা খেতে পারছি না, ঠিক তেমনি খাদ্যের অভাবে গরু-বাছুর-ছাগলগুলো অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে রয়েছে। চিনাডুলীতে আশ্রয় নিয়েছে দুই শতাধিক পরিবার। তাদের মধ্য থেকে আবদুল ওয়াদুদ বলেন, বানের পানি একদিন শুকিয়ে যাবে। কিন্তু এ অঞ্চলে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। সেই ক্ষতি দীর্ঘকাল বহন করতে হবে। বন্যা-দুর্গতদের পাশাপাশি সরকারি শত শত কিলোমিটার রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, রেললাইনসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ বন্যায় ধ্বংস হচ্ছে। পাশাপাশি এলাকার লাখ লাখ মানুষ প্রতিবছর দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
পার্থশী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইফতেখার আলম বাবুল, চিনাডুলী ইউপির চেয়ারম্যান, আব্দুস ছালাম, বেলগাছার ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক জানান, একসময়ে এ অঞ্চলে বন্যার রক্ষাকবজ হরিণধরা বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধটি ছিল। সে সময় জামালপুরে এত বন্যা হয়নি। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর যমুনার ভাঙনে বিলীন হওয়ার পর থেকে জামালপুরের মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে কারণে আমরা আজ দরিদ্রতার কষাঘাতে নিষ্পেষিত। দক্ষিণ চিনাডুলী ষাটোর্ধ্ব আঃ করিম, আছাদ আলী, আব্দুর রহিম, সালমা বেগম, মনিরা তাদের প্রাণের দাবি আমরা প্রতিবছর ত্রাণ সাহায্য চাই না। আমরা পূর্বের ন্যায় বন্যা-নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ চাই।
জামালপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ ফরিদুল হক খান দুলাল বলেন, বাঁধটি নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর নিকট দাবি জানানো হয়েছে। এটি নির্মাণে সরকারের পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানান ।
ইত্তেফাক/নূহু
