বাড়ির উঠোনে কোমর পানি গৃহবধূ রাশেদা বেগমের। পানি ঢুকে দেবে গেছে ঘরের মেঝে। স্বামী আক্কাছ আলী, দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে সংসার। ভ্যান চালক স্বামী, সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যে রাশেদা বেগম সাত মাসের গর্ভবতী। চলাফেরা কষ্টকর হলেও ইট দিয়ে চকি উঁচু করে স্বামী, ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাস করছেন।
বন্যার পানি ঘরে ঢুকলেও বাড়ি ছাড়েননি তারা। কোথায় যাবেন ছেলে মেয়েদের নিয়ে। বানের কারণে স্বামীর কাজ নেই। কোথাও থেকে ত্রাণও পাননি। কেউ তাদের খোঁজ নেয়নি কিভাবে তারা বেঁচে আছেন। শরীরের এই অবস্থায় ছেলেমেয়েদের দুমুঠো চাল ফুটিয়ে দেবেন তারও জোগাড় নেই। প্রাকৃতিক কাজে সীমাহীন দূর্ভোগের মধ্যেই দিন পার করছেন।
এবারের বন্যায় এমনই অনাকাঙ্খিত কষ্টে আছে মানিকগঞ্জের রাশেদা বেগমের মতো হাজারো নারী। আর দুর্ভোগ - দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই শিশুদের নিয়ে।
সরেজমিনে গত রবিবার ঘিওরের দ্বিমুখা এলাকায় দেখা যায়, বুক সমান পানি পার হয়ে ভেজা মালপত্র রাস্তায় এনে শুকোচ্ছেন বেশ কয়েকজন নারী। অনেকের রান্নাটাও চলছে নৌকায়, উঁচু চালে কিংবা রাস্তাতেই। এরই মধ্যে থেমে থেমে বৃষ্টি যোগ করছে ভোগান্তির নয়া মাত্রা। সবমিলিয়ে জেলার প্রায় ৫০ হাজার নারী-শিশুদের নাওয়া, খাওয়া, টয়লেট এবং ঘুমানো যে কতটা মানবিক কষ্ট অতিক্রম করছে, তা চোখে না দেখলে বোঝা মুশকিল।
কারো ঘরে বুক পানি, কারো ঘরে হাঁটু পানি। চারিদিকে শুধু পানি আর পানি। দিন চারেক আগে মাঝ রাতে হু হু করে ঢুকে পড়ে বন্যার পানি। এতে প্লাবিত হয়েছে মানিকগঞ্জের বির্স্তীণ এলাকা। বন্যার পানি বাড়তে শুরু করার পর থেকে ভোগান্তি আর জৈবিক কার্যাদীর কষ্ট বেড়ে গেছে বহু গুণে। অনেকেই অর্ধাহারে করছে মানবেতর জীবন যাপন। কর্মচঞ্চল খেটে খাওয়া মানুষগুলো হয়ে পড়েছে বেকার। তলিয়ে যাওয়া ফসলী জমি আর অর্ধ নিমজ্জিত বাড়ি ঘরের দিকে উদাস নয়নে তাকিয়ে আছে ফ্যালফ্যাল করে।
অপেক্ষাকৃত উঁচু অন্যের বাড়িতে, সড়কে, স্থানীয় ইউপি পরিষদে, বাঁধ ও স্কুলে আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা কবলিত মানুষ। সেই সঙ্গে একই ছাউনিতে আশ্রয় মিলেছে ভেড়া, গরু ও ছাগলের। গবাদী পশু নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন কৃষকেরা। মাথার ওপরে পলিথিনের ছাউনী, ভেজা স্যাতঁস্যাতে মাটিতে রাস্তায় চট বিছিয়ে শুইয়ে আছে নারী, শিশু, বৃদ্ধ। বাড়িঘরে পানি ওঠায় কারো ভিজে গেছে কাঁথা-কাপড়, বিছানা। শিক্ষার্থীদের বইও ভিজে একাকার। সামনেই পরীক্ষা। লেখাপড়া বিঘ্নিত হচ্ছে মারাত্মকভবে।
মানিকগঞ্জের দৌলতপুর চরাঞ্চলের ১৪ বছরের শিশু আশা আক্তার। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সে। এ সময়টাতে স্কুলে সমবয়সীদের হৈ-হুল্লোড় করে, খেলার সঙ্গীদের সঙ্গে গ্রামের পথঘাট চষে বেড়ানোর কথা তার। কিন্তু বন্যায় ভিটে-মাটি ভেঙে গেছে। সেই সঙ্গে শেষ হয়েছে বড় হওয়ার স্বপ্ন। এ জেলার চরাঞ্চলসহ বেশ কিছু এলাকার শিশুদের ভাগ্যে ঘটেছে একই পরিণতি। বন্যার কারণে বছর বছর এভাবে স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে হাজারো শিশু। অভাব আর দুর্যোগ কেড়ে নিচ্ছে তাদের মানসিক বিকাশ, শৈশব-কৈশরের উচ্ছ্বাস।
বিশিষ্ট নারী নেত্রী ও মানিকগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক লক্ষী চ্যাটার্জ্জী বলেন, বন্যায় সবচেয়ে বেশি দূর্ভোগের শিকার হন নারীরা। খাবার-সন্তান আগলে রাখা ও পয়:নিষ্কাশন ব্যবস্থায় নারীরা মানবেতর জীবন যাপন কেরন। তাই মানবিক বিপর্যয় এড়াতে যার যার অবস্থান থেকে বানভাসী মানুষের পাশে যেন আমরা দাঁড়াই। এটা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব।
ইত্তেফাক/নূহু
