জমিদার বাড়ি মানেই অপূর্ব কারুকাজ করা বিশাল ভবন। দেয়ালের প্রতিটি পরতে পরতে সৌন্দর্যের ছোঁয়া, ইতিহাস ও ঐতিহ্যর সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা।
অন্যান্য জমিদার বাড়ির চেয়ে একটু হলেও বাড়তি সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া যায় কুমিল্লার তিতাস উপজেলার মজিদপুর জমিদার বাড়িতে। এখানে পাশাপাশি কয়েকটি ভবন রয়েছে। প্রতিটি ভবনই চমত্কার কারুকার্যমণ্ডিত। তবে অবহেলায় জমিদারী ঐতিহ্য ক্রমেই ম্লান হতে চলেছে।
কুমিল্লা থেকে ৫০ কিলোমিটার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে গৌরীপুর বাস ষ্টেশন থেকে হোমনা-গৌরীপুর সড়কের ১০ কিলোমিটার উত্তরে তিতাস উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন অবস্থিত। কমপ্লেক্স ভবন সংলগ্ন কড়িকান্দি বাজার থেকে ঠিক পশ্চিমদিকে ৫ কিলোমিটার গেলেই চোখে পড়বে কালের সাক্ষী মজিদপুর জমিদার বাড়ি।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, ইংরেজ আমলের প্রথমদিকে লর্ড কর্নওয়ালিস জায়গীরদারী প্রথাকে বিলুপ্ত করে জমিদারি প্রথা প্রচলন করেন। কিন্তু তত্কালীন মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ভাব থাকার কারণে ইংরেজরা হিন্দু বুদ্ধিমান ও তাবেদার শ্রেণির লোকদেরকে জমিদারি প্রদান করেন।
বৃহত্তর দাউদকান্দি মূলত. মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা বিধায় এখানে কোন প্রভাবশালী জমিদার ছিলেন না। সোনারগাঁয়ের হিন্দু জমিদারদের অধীনেই পরিচালিত হত দাউদকান্দি পরগণা। তবে তিতাসের মজিদপুরে হিন্দু জমিদার বাড়ির নিদর্শন এখনও বিদ্যমান রয়েছে। মোট ১৭টি অট্টালিকার মধ্যে ৪টি ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে।
জমিদার বাড়ির আশেপাশে ১টি দীঘি এবং ছোট-বড় মিলে ২০টি পুকুর রয়েছে। যদিও দীর্ঘদিন যাবত্ই জমিদারদের প্রাসাদোপম অট্টালিকাসমূহ মুসলমানদের দখলে রয়েছে। বর্তমানে তাদের কোন উত্তরাধিকারীর সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পাকিস্তান সৃষ্টির পরই হিন্দু জমিদাররা তাদের সবকিছু পরিহার করে ভারতে চলে যান। বর্তমানে সবগুলো ভবনই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ভবনগুলোর মাঝে সুড়ঙ্গ পথও রয়েছে।
জমিদারি শাসনের শুরুর দিকে মজিদপুর জমিদার বাড়ির প্রথম পুরুষ শ্রী রামলোচন রায় মজিদপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। মেঘনা, তিতাস, হোমনা ও মুরাদনগর পর্যন্ত তাদের জমিদারি ছিল। শ্রী রামলোচন রায়ের তিন পুত্র শ্রী কালীচরণ রায়, ব্রজেন্দ্র কুমার রায় এবং শিবচরণ রায়। জমিদারি আইন বিলুপ্ত হওয়া পর্যন্ত বংশ পরম্পরায় তাদের জমিদারি চলে। শ্রী কালীচরণের পাঁচ ছেলে যথাক্রমে পিয়ারী মোহন রায়, বিহারী মোহন রায়, শশী মোহন রায়, শরত্চন্দ্র রায় এবং মোহিনী মোহন রায়।
ব্রজেন্দ্র কুমার রায়ের তিন ছেলেরা হলেন, ক্ষিতিষ চন্দ্র রায় যিনি মজিদপুর ইউনিয়নের প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন, গিরিশ চন্দ্র রায় এবং শিরিশ চন্দ্র রায়। শিবচরণ রায়ের দুই ছেলে হলেন, হরলাল রায় এবং যোগেশ চন্দ্র রায়। শিরিশ চন্দ্র রায় গর্ভবতী স্ত্রীকে হত্যা করে উন্মাদ হয়ে যান। তাকে জমিদার বাড়ির একটি প্রকোষ্টে শিকল দিয়ে বেঁধে রাখা হতো। এ অবস্থাই তার মৃত্যু হয়। ক্ষিতিশ চন্দ্র রায়ের দুই পুত্র শ্রী নারায়ণ চন্দ্র রায় এবং শ্রী দুর্গাচরণ রায়। শ্রী দুর্গাচরণ রায়ের তিন পুত্রের মধ্যে ক্ষেত্র মোহন রায় তিতাস উপজেলার প্রথম এন্ট্রাস পাস, প্রথম গ্রাজুয়েট এবং প্রথম আইনজীবী হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। অপর ছেলে কুঞ্জ মোহন রায় মজিদপুর ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। শরত্ চন্দ্র রায়ের ছেলে উপেন্দ্র চন্দ্র রায় তিতাস উপজেলার প্রথম গ্রাজুয়েট ডাক্তার।
রামলোচন ছাড়াও তাদের বংশের আরও যারা জমিদারি করেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, রাম সুন্দর রায় এবং রামগতি রায়। এদের মধ্যে রামগতি রায়ের পুত্র নলিনী ভূষণ রায় মজিদপুর ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট ছিলেন।
স্থানীয় লোকজনের সাথে আলাপ করে জমিদার কর্তৃক মুসলমানদের উপর নানান অত্যাচার ও জোর-জুলুমের কথা জানা যায়। খাজনা, লগ্নি ও মহাজনী সুদের টাকা সময়মত পরিশোধ করতে না পারলে বন্ধকী সম্পত্তি জবরদখল করে নিত এবং নির্যাতন চালাত। মুসলমানরা তাদের বাড়ির নিকট দিয়ে জুতা পায়ে এবং ছাতা মাথায় দিয়ে যেতে পারতো না। মৌটুপি নিবাসী অত্যন্ত তেজস্বী নির্লোভ চরিত্রের ব্যক্তিত্ব হাবিবুর রহমান মাষ্টার ইউনিয়ন বোর্ডের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তাদের অত্যাচার থেকে মুসলমানরা রক্ষা পায় এবং প্রায় ২শ বছর পূর্বে হিন্দু জমিদাররা এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
মজিদপুর ইউপি চেয়ারম্যান ফারুক মিয়া সরকার বলেন, জমিদার বাড়িটি রক্ষার জন্য উপজেলা প্রশাসনের সাথে একাধিক আলোচনা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মকিমা বেগম বলেন, মজিদপুর মজিদার বাড়িটি আমি একাধিকবার পরিদর্শন করেছি। বাড়িটি ঐতিহ্যমণ্ডিত। বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যটন নগরী হিসেবে যাতে ঘোষণা করা হয় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে অবহিত করা হয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
