ত্রাণের লোভে রোহিঙ্গা সাজছে বাঙালিরা

আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৫৮

ক্যাম্পের নেতারা এ কাজে সাহায্য করছে—

তাদের কার্ড বাতিল হবে :শরণার্থী কমিশনার

সায়ীদ আলমগীর, কক্সবাজার

রোহিঙ্গাদের জন্য প্রদত্ত বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা ও ত্রাণের লোভে কিছু বাংলাদেশি নাগরিক রোহিঙ্গা সাজছে। শরণার্থী ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের নিবন্ধনের জন্য যে ডাটাবেজ খোলা হয়েছিল সেখানে কিছু বাংলাদেশি নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে। আবার অনেক প্রবাসী বাংলাদেশি রাখাইনের বিভিন্ন এলাকার ওক্কাট্টা (চেয়ারম্যান) ও সমাজ প্রধানসহ আশপাশের এলাকা সম্পর্কে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে বিদেশে রাজনৈতিক সহযোগিতা পাবার চেষ্টা চালাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এমন সব তথ্য জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয়রা জানান, উখিয়া-টেকনাফে শরণার্থী ক্যাম্পে ত্রাণ ও মানবিক সহায়তা পাবার আশায় রোহিঙ্গা সেজেছে কয়েকশ বাংলাদেশি। দরিদ্র কিছু বাংলাদেশি ত্রাণের লোভে পরিচয় গোপন রেখে রোহিঙ্গা তালিকায় নাম তুলেছে। আবার অবস্থাসমপন্ন কিছু বাংলাদেশিও প্রতারণা করছে। তালিকাভুক্ত হয়ে তারা শরণার্থী ক্যাম্প থেকে নিয়মিত ত্রাণও নিচ্ছে। ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণকারী রোহিঙ্গা নেতারা অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গা সাজতে সহযোগিতা করছে বলে জানা গেছে।

টেকনাফ উপজেলার লেদা, নয়াপাড়া, শামলাপুর ও উখিয়ার   শিবিরের রোহিঙ্গা নেতাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা স্বীকার করেছেন কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. আবুল কালামও। তিনি বলেন, বাঙালিদের রোহিঙ্গা সাজার বিষয়টি খতিয়ে দেখে তাদের কার্ড বাতিল করা হবে। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২২শ পরিবারের ১৩ হাজার রোহিঙ্গা টেকনাফের শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরে বাস করছে। তবে ২৩ নম্বর এই শিবিরটির সঙ্গে অন্য শিবিরের তফাত্ হলো, এখানে বাঙালি আর রোহিঙ্গা একই গ্রামে থাকে। এই শিবিরের পাশে অবস্থিত নয়াপাড়া শিলখালী গ্রাম। সেখানে ১ নম্বর ওয়ার্ডে টিনশেড ইটের ঘরে বাস করছেন এক বাঙালি নারী। তাদের আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো। এই নারী একদিকে বাংলাদেশের সব কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন, অন্যদিকে শরণার্থী হিসেবে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাও ভোগ করছেন। বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তার নাম ছেনুয়ারা বেগম, বয়স ৪০। স্বামী আবদুল হক। পরিচয় নম্বর ২২১৯৭৬৫৯৫৫০৭। আবার বিশ্ব খাদ্য সংস্থায় রোহিঙ্গাদের ডাটাবেজে তিনি নাম দিয়েছেন রহিমা। স্বামী করিম উল্লাহ।

শুধু তাই নয়, স্থানীয় দুই বাংলাদেশি শিশু সন্তানকে নিজের সন্তান বানিয়ে রোহিঙ্গা ডাটাবেজে নাম ঢোকান এই নারী। তাদেরও দুটি পরিচয়, দুই নাম।  আহমদ (১০), রোহিঙ্গা কার্ডে রেদোয়ান এবং ফাতেমা আক্তার (৯), রোহিঙ্গা কার্ডে রেহেনা বেগম। শুধু ছেনুয়ারা বেগমই নয়, এ রোহিঙ্গা শিবিরে শতাধিক বাঙালি একইভাবে রোহিঙ্গা সেজে সাহায্য সংস্থার সহযোগিতা নিচ্ছে। অভিযুক্ত ছেনুয়ারা বেগম নিজেকে মিয়ানমারের নাগরিক পরিচয় দিয়ে বিশ্ব খাদ্য সংস্থার কার্ড দেখিয়ে বলেন, আমি অনেক পুরনো রোহিঙ্গা। ত্রাণের মাধ্যমে কোনো রকম সংসার চলে। আমি তো বাংলাদেশি না। এই নারীর স্বামী আবদুল হক প্রথমে তার স্ত্রীকে মানসিক রোগী বলে দাবি করলেও পরে সব অপকর্ম স্বীকার করে দোষ চাপিয়ে দেন স্ত্রীর ওপর।

শামলাপুর রোহিঙ্গা শিবিরের নেতা আবুল কালাম জানান, তার শিবিরে অর্ধশতাধিক বাঙালি রোহিঙ্গা সেজেছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পুরো রোহিঙ্গা শিবিরের হিসাব করলে এই সংখ্যা দুই শতাধিক হবে।

‘রোহিঙ্গা’র পরিচয় নেওয়া শিশু আহমদের বাবা শামসুল আলম বলেন, তার সন্তানকে জোর করে নিয়ে স্থানীয় ছেনুয়ারা বেগম নিজের সন্তান বানিয়ে রোহিঙ্গা সাজিয়েছে। এটি খুবই লজ্জাজনক। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি মোহাম্মদ ইউনুছ বলেন, এলাকায় বেশকিছু বাঙালির রোহিঙ্গা সাজার খবর আমি শুনেছি। বিষয়টি কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। এই শিবির সংলগ্ন মৌলভিপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নুরুল আলমের স্ত্রী ছেমন বাহার (৪৪)। তিনি আমিনা খাতুন (৩৯) পরিচয়ে রোহিঙ্গা সেজেছেন। তিনি বলেন, রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে আমাদের সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। কারণ ফসলি সব জমি তাদের দখলে চলে গেছে। যে কারণে বাধ্য হয়ে নিজের বাঙালি পরিচয় গোপন রেখে রোহিঙ্গা সেজে ত্রাণসহ বিভিন্ন সাহায্য সংগ্রহ করছি। টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রবিউল হাসান বলেন, শামলাপুরের বিষয়টি শুনেছি। অভিযোগ খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।