কেউ গুলিবিদ্ধ, কেউ আগুনে পুড়ে ছটফট করছেন, কারো পা উড়ে গেছে ল্যান্ডমাইনে। শরীরের ভাঁজে ভাঁজে যন্ত্রণা। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনের পর দিন পাহাড়, জঙ্গল, নদী পার হয়ে যখন বাংলাদেশে ঢুকবেন ঠিক তখনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছেন অসহায় রোহিঙ্গারা। কেউ মরছেন নৌকাডুবিতে, কেউবা যন্ত্রণায় কাঁতরাতে কাঁতরাতে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করছেন। আবার কাউকে সীমান্তের জিরো পয়েন্টে এসেই গুলি করে হত্যা করছে মিয়ানমার সৈন্যরা। সাগর-নদীর লাশ ভেসে আসছে উপকূলে। আর স্থলপথে নিহতদের লাশ কাঁধে নিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছেন কারো কারো স্বজন। এর বাইরেও যে কতো লাশ পচে মাটিতে মিশছে সেই হিসেব নেই এপারের কারো কাছে।
মিয়ানমার সরকার ও সৈন্যদের পরিচালিত নির্দয় ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ এর স্বীকার হয়ে হাজারো রোহিঙ্গাকে এই পরিণতি বরণ করতে হচ্ছে। উত্তাল সাগরে যখন নৌকা ডুবছে তখন ঢেউয়ের তোড়ে মায়ের আঁঁচল থেকে ছিটকে পড়ছে ছোট্ট শিশু, সন্তানের হাত থেকে ছিটকে যাচ্ছে বৃদ্ধ মা-বাবা। তারপর তারা লাশ হয়ে ভেসে আসছে উপকূলের দিকে। আবার কারো লাশ হারিয়ে যাচ্ছে গভীর সাগরে। আর স্থলপথে মাইলের পর মাইল পাহাড়, জঙ্গল, ফসলি জমি অতিক্রম করে ক্লান্ত হয়ে অনাহারে কেউ কেউ হিংস্র মিয়ানমার জান্তাকে ঘৃণা জানিয়ে চলে যাচ্ছেন ওপারে। যেসব লাশ এপারে আসছে তাদের কোনোমতে দাফনের ব্যবস্থা হলেও আরো কতো লাশ দাফন ছাড়া পচে গলে মাটিতে মিশছে তার হিসেব বের করা দূরহ।
বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্তের নাইক্ষংছড়ি, উখিয়া, টেকনাফের পথে পথে গা হিম হয়ে আসা এসব গল্প এখন নিত্যদিনের। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বকোণের তল্লাটে তল্লাটে, পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে, ফসলি জমিতে, নদী-খালে এখন কেবল রোহিঙ্গাদের পঁচা ও পোড়া লাশের গন্ধ। মিয়ানমার সরকার ও সৈন্যদের চরম নারকীয় নির্যাতনের স্বীকার হয়ে মানবতার চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠি হিসেবে পরিচিত মুসলিম রোহিঙ্গারা।
গতকাল বৃহস্পতিবার উখিয়া নাফনদী পালংখালী পয়েন্টের একটি মসজিদের উঠানে সারি করে রাখা হয় পাঁচটি রক্তাক্ত নিথর দেহ। যাদের মধ্যে চারজন পুরুষ, তারা সবাই গুলিবিদ্ধ। একজন নারী, যাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। স্বজনরা তাদের লাশ এনেছে এপারে। সীমান্তের তমব্রু এলাকায়ও মিলেছে পঁচনধরা আরো একটি লাশ।
এসব লাশের মধ্যে একজন মোমেনা খাতুনের বাবা। মোমেনার বাড়ি রাখাইনের বুচিদং এলাকায়। লাশের পাশে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন তিনি। তারপর বলছিলেন, প্রাণে বাঁচতে গত বুধবার দুপুরের দিকে মিয়ানমার সীমান্ত পার হয়ে নাফ নদীর জিরো পয়েন্টে ঢোকেন তারা। এসময় মিয়ানমার সৈন্যরা জিরো পয়েন্টে এসে তার বাবা ফজলু রহমান, একই বাড়ীর সৈয়দ আলম, শামসুল আলম, নজিব আলমকে গুলি করে হত্যা করে। আর সুফিয়া খাতুনকে কুপিয়ে হত্যা করে।
২৪ ঘন্টায় ২৩ লাশ : স্থলপথে যখন এই অবস্থা, নদীপথে তখন আরো করুণ অবস্থা। মিয়ানমার সৈন্যদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে নাফ নদীতে একের পর এক রোহিঙ্গাদের বহনকারী নৌকা ডুবছে। গত এক সপ্তাহে নৌকাডুবিতে শিশুসহ ৫০ জনের অধিক রোহিঙ্গার লাশ নদীতে ভেসে উঠেছে। সর্বশেষ বুধবার দুপুর থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
কেউ মুমূর্ষু, কেউ পাঞ্জা লড়ছে মৃত্যুর সাথে : মিয়ানমারের নারকীয় তান্ডব থেকে প্রাণে বাঁচতে অনাহারে-অর্ধাহারে দীর্ঘ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে অনেক রোহিঙ্গা সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছলেও খাবার, পানি ও ওষুধের অভাবে দিন দিন মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে। গুলিবিদ্ধ, অগ্নিদ্বগ্ধ হওয়ার পরও প্রাণ বাঁচতে যন্ত্রণা ভোগ করে যারা সীমান্তে এসেছেন তারা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। তবে কেউ কেউ বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সার সুযোগ পাচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৩০ জনেরও বেশি গুলিবিদ্ধি ও অগ্নিদ্বগ্ধ রোহিঙ্গা চিকিত্সা নিয়েছেন। এছাড়াও কক্সবাজারের বিভিন্ন এনজিও পরিচালিত হাসপাতালেও শতাধিক রোহিঙ্গ চিকিত্সা নিয়েছেন।
বাংলাদেশের নমনীয়তায় বেড়ে গেছে অনুপ্রবেশ: মিয়ানমারে সৈন্যদের অভিযান শুরুর প্রথমদিকে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের হার কম থাকলেও গত কয়েকদিনে বিজিবির নমনীয়তায় ও রোহিঙ্গাদের থাকার জন্য নতুন জায়গার ব্যবস্থা করার ঘোষণায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত অন্তত ১ লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের তথ্য দিলেও বাস্তবে এই সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সীমান্ত কর্মরত বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা। এরমধ্যে গত বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত ৩৫ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তান্ডব চলছেই : সীমান্তের এপারে যখন রোহিঙ্গারা এমন দুর্দশায় পতিত, তখন ওপারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোতে এখনো থামেনি গুলির শব্দ। সেখানে এখনো প্রতিনিয়ত থেমে থেমে গুলির শব্দ, হেলিকপ্টার টহল অব্যহত আছে। গত বৃহস্পতিবারও তমব্রু, ঢেকিবুনিয়া এলাকার গ্রামগুলোতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলতে দেখা গেছে। দূরবর্তী এলাকাগুলো থেকে ধোঁয়ার কুন্ডলী উড়তে দেখা গেছে। সদ্য অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের ভাষ্য, সৈন্যরা এখনো গ্রামের পর গ্রামে আগুন দিয়ে যাচ্ছে।
চলছে অনলাইন যুদ্ধ: রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর জাতিগত নিপিড়নের বিরুদ্ধে বিশ্বের নানাপ্রান্ত থেকে ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিবাদের সাথে এবার দেশটির বিভিন্ন ওয়েবসাইটে হানা দিচ্ছে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের হ্যাকাররা। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর হামলার প্রতিবাদে দেশটির সরকারি ওয়েব সাইটসহ বিভিন্ন ওয়েবসাইটে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ, তুরস্ক, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের হ্যাকাররা।
১ লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে:জাতিসংঘ
রাখাইন অঞ্চলে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংস গণহত্যা থেকে বাঁচতে ২৫ আগস্ট থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৬৪ হাজার রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্ত অতিক্রম করছে। শরনার্থী বিষয়ক জাতিসংঘ সংস্থা ইউএনএইচসিআর এর মুখপাত্র ভিভিয়ান তান বৃহস্পতিবার বার্তা সংস্থা এপি’কে এ কথা জানিয়েছেন। এর ভিত্তিতে ‘ওয়াশিংটন পোষ্ট’ প্রতিকেদনও করেছে।
রোহিঙ্গায় ছেঁয়ে গেছে টেকনাফ
টেকনাফ (কক্সবাজার) সংবাদদাতা জানান, কক্সবাজারের টেকনাফ জুড়ে এখন শুধু রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা। যে দিকে চোখ পড়ছে সে দিকেই কেবল রোহিঙ্গাদের ঢল দেখা যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী এ উপজেলা একেবারে রোহিঙ্গায় ছেঁয়ে গেছে। গ্রামে গঞ্জে, রাস্তা ঘাটে, পাহাড়ে এবং নদীর ধারে শুধু রোহিঙ্গাদের বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
ইত্তেফাক/নূহু
