হাসপাতালগুলির অগ্নিনিরাপত্তা

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৪৪

ঢাকার কোনো এলাকাই যেন আর নিরাপদ নাই! কারণ, সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যমতে, রাজধানীতে শতকরা ৯৭.৫ ভাগ হাসপাতাল, ২৮টি বাণিজ্যিক ভবন ছাড়াও ৩৩০০ ভবন অগ্নিঝুঁকিতে রহিয়াছে। সর্বশেষ রাজধানীর বনানীতে এফ আর টাওয়ারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ২৫ জন নিহত ও অনেকে আহত হইয়াছেন। ইহার ঠিক ৩৬ দিন আগে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় কেমিক্যাল গুদামে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মারা যান ৭১ জন। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ প্রায় দুই বত্সর আগেই জানাইয়াছিল, অগ্নিকাণ্ডের ভয়াবহ ঝুঁকিতে রহিয়াছে রাজধানী ঢাকার ৪২২টি হাসপাতাল। প্রতিবেদনে ১৭৪টিকে ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ ও ২৪৮টিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ ঘোষণা করা হইয়াছিল। প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ লইতে হাসপাতালগুলিকে একাধিকবার সতর্কীকরণ চিঠিও দিয়াছে সংস্থাটি। দেওয়া হইয়াছে ৩০ দফা নির্দেশনাও। বলা হইয়াছিল, হাসপাতালগুলি যদি সমস্যার দ্রুত সমাধান না করে তাহা হইলে বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হইতে পারে, ঘটিতে পারে ব্যাপক প্রাণহানি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং হাসপাতালগুলিতে অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশনা দিয়াছিলেন। কিন্তু দুইটি প্রতিষ্ঠান ব্যতিরেকে এই দীর্ঘ সময়ে কাহারো টনক একটুও নড়ে নাই, নেওয়া হয় নাই তেমন কোনো কার্যকর পদক্ষেপও।

গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটে। কেহ হতাহত না হইলেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আনিতে এবং রোগীদের পুনর্বাসনে বেগ পাইতে হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। তাহার পরেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজ শুরু করিয়াছে এই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে বৈদ্যুতিক সঞ্চালন লাইন মেরামত, ফায়ার এক্সটিংগুইশারের আধুনিকায়ন, পানির বিকল্প সোর্স স্থাপনসহ একাধিক বহির্গমন পথ সৃষ্টির ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে। সোহরাওয়ার্দী ব্যতিরেকে কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) অগ্নিনির্বাপণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়াছে। তবে বিএসএমএমইউ-এর ডি-ব্লক নিয়া সেখানে কর্মরত চিকিত্সকেরা বেশ শঙ্কিত। সুউচ্চ ওই ভবনটিতে নাই পর্যাপ্ত খোলামেলা স্থান, জরুরি বহির্গমনের ব্যবস্থা, বিকল্প সিঁড়ি, এমনকি সকল লিফট এক জায়গায়। এই দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পুরাতন ভবনের অবস্থাও তথৈবচ। সুদীর্ঘ এই ভবনে জরুরি বহিঃনির্গমন ব্যবস্থা নাই বলিলেই চলে। নির্দিষ্ট দূরত্বে কিছু গেট থাকিলেও সেইগুলি থাকে বন্ধ। মিটফোর্ড হাসপাতালের অবস্থা আরো করুণ। বস্তুত, সরকারি বেসরকারি পর্যায়ের প্রায় সকল প্রতিষ্ঠানের অবস্থাই ঝুঁকিপূর্ণ।

গত ২১ মার্চ বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিদুর্ঘটনার পর আবারও নড়িয়াচড়িয়া বসিয়াছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সরকারি হাসপাতালগুলিতে অগ্নিনির্বাপণে কী ধরনের ব্যবস্থা আছে তাহা জানিতে চহিয়াছে এবং অগ্নিনির্বাপণ মহড়া আয়োজনেরও নির্দেশনা দিয়াছে। আর স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানাইয়াছেন, হাসপাতালগুলির অগ্নিনির্বাপণ সক্ষমতা বাড়াইতে একটা বড় পরিকল্পনা নেওয়া হইয়াছে। তবে বাস্তবায়নে সময় লাগিবে। সকল হাসপাতালে ফায়ার অ্যালার্ম এবং ধোঁয়া শনাক্তকরণসহ প্রয়োজনীয় সকল যন্ত্র স্থাপন করা হইবে। আমরা এই উদ্যোগগুলিকে সাধুবাদ জানাই। আমরা জানি, বিভিন্ন স্তরে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে সরকারি কর্মকাণ্ডে দীর্ঘসূত্রতা কাজ করে। কিন্তু, জনস্বাস্থ্য ও জননিরাপত্তার বিষয়টি যেকোনো বিচারেই অগ্রাধিকার পাওয়া দরকার। প্রয়োজনে বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করিয়া হইলেও অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক বলিয়াই আমরা মনে করি। বনানীর এফ আর টাওয়ারে প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডের পরে দেখা যাইতেছে, গত এক দশকে টাওয়ারটি নিয়া রাজউক অন্তত চারটি চিঠি দিয়াছে, যাহার দুইটিতে তাহারা ভবনটিকে বৈধ এবং দুইটি চিঠিতে অবৈধ বলিয়া জানাইয়াছে! জনজীবন বিপন্নকারী এইরূপ ভয়ানক দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনাগুলি চিহ্নিত করিয়া কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণেরও আহ্বান জানাই আমরা।