ভারতের লোকসভা নির্বাচন

রাহুলও দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী নন!

আপডেট : ০৭ এপ্রিল ২০১৯, ২২:২৪

 

ভারতের আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সর্বশেষ গত শুক্রবার দ্য হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের তুলনায় এবার দেশজুড়ে নরেন্দ্র মোদির গ্রহণযোগ্যতা আরো বেড়েছে। ৪৩ শতাংশ ভোটার মোদিকে আবারো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। অন্যদিকে ২৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চান। যদিও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হিসেবে বিরোধীরা এখনো কারও নাম ঘোষণা করেনি। নির্বাচনের পরই প্রধানমন্ত্রী কে হবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে তারা।

প্রায় সব জনমত জরিপের ফল একই রকম। নরেন্দ্র মোদি যেকোনো ভারতীয় নেতার চেয়ে অনেক ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছেন। কিন্তু কারো কারো মতে, নির্বাচনের এই মুহূর্তে এসে বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী ব্যবধানটা কমিয়ে আনতে সমর্থ হয়েছেন। বিজেপি যাকে কটাক্ষ করে ‘পাপ্পু’ বলত, তিনি এখন আর তুচ্ছ করার মতো অবস্থানে নেই। অন্তত গত ডিসেম্বরে বিজেপির হার্টল্যান্ড খ্যাত তিন রাজ্যে কংগ্রেসের জয়ের পর এটা বলা মোটেও যুতসই নয়।

এনডিটিভির এক নিবন্ধে সুরেন্দ্র কুলকার্নি লিখেছেন, ‘এ+’ ইশতেহার ঘোষণা করে রাহুল গান্ধী নিজেকে একজন ‘সিরিয়াস প্রতিদ্বন্দ্বী’ প্রমাণ করেছেন। তিনি লিখেছেন, একজন সত্যিকারের নেতা অন্য যে কারও চেয়ে নিজেকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেন। এবারের ইশতেহারে দুটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কংগ্রেস। একইসঙ্গে বলেছে, কংগ্রেস এই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে। ইশতেহার পত্রের শুরুতেই ভারতবাসীর উদ্দেশে কংগ্রেস নেতা রাহুল লিখেছেন, আমি যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা কখনোই ভঙ্গ করিনি। যদি আমার দল প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থ হয় তার জন্য আমাকেই জবাবদিহিতার মুখোমুখি করুন।

সম্প্রতিকালে ভারতীয় গণমাধ্যমে, প্রচার-প্রচারণায় জোর দিয়েই বলা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি দ্বিতীয় মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন। যদিও ২০১৪ সালের চেয়ে বিজেপির আসন উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। ২০১৪ সালের  মতো মোদি জোয়ারও এবার নেই। তবে আকস্মিকভাবে পরিস্থিতি বদলেও যেতে পারে। যেভাবে ২০০৪ সালে কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী পরিস্থিতি বদলে দিয়েছিলেন। বিজেপির অটল বিহারী বাজপেয়ীর মতো নেতার বিরুদ্ধে কংগ্রেসকে জয়ী করেছিলেন তিনি।

সম্প্রতিকালে বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রকে নিয়ে কংগ্রেসের নতুন করে পুনরুত্থান ঘটিয়েছেন রাহুল গান্ধী! সর্বশেষ চমক দিয়েছেন এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী ইশতেহার ঘোষণা করে। যাকে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছে। তবে সত্য হলো, ভারতের নির্বাচনের ইতিহাসে কোনো রাজনৈতিক দল এখন পর্যন্ত এত ভালো, বিস্তারিত ও পরিকল্পিত ইশতেহার দিতে পারেনি।

কংগ্রেসের ইশতেহার আরেকটি কারণে খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। তা হলো, বিজেপি যখন উগ্র জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িতকতার বিষবাস্প ছড়িয়ে নির্বাচনের পরিবেশ দূষিত করছে, তখন কংগ্রেস তাদের ইশতেহারে সব ইস্যুর ওপর যেমন জোর দিয়েছে; তেমনি সমন্বিত ও প্রগতিশীল লক্ষ্যকে সামনে এনেছে।

এই ইশতেহার তৈরিতে রাহুল গান্ধী দুটি বিষয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। একটি হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো এবং দ্বিতীয়টি হলো তার বাস্তবায়ন। তিনি এমন কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চাননি যা বাস্তবায়নযোগ্য নয়। রাহুলের মতে, এবারের ইশতেহার হলো বছরব্যাপী প্রচেষ্টার ফল এবং বাস্তব। ইতিমধ্যে ইশতেহারের ‘ন্যায়’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে ভারতের ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। যেখানে ভারতের প্রায় ৫ কোটি পরিবারকে বছরে ৭২ হাজার রুপি করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে কংগ্রেস। একইসঙ্গে কংগ্রেসের ইশতেহারে অর্থনৈতিক সমস্যা, বেকারত্বের মতো বিষয়গুলোতে জোর দেওয়া হয়েছে।

কংগ্রেস নেতৃত্ব জম্মু-কাশ্মিরে সেনা বাহিনীর (বিশেষ ক্ষমতা) আইন পর্যালোচনার মতো সাহসী প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। একইসঙ্গে সেনা মোতায়েনের বিষয়টিও পর্যালোচনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এজন্য কংগ্রেস অভিনন্দন পাওয়ার যোগ্য। তবে এটাও সত্য যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইশতেহারে দুর্বলতা রয়েছে। তারপরও এটা স্বীকার করতে হবে যে, মোদির বিজেপিকে ঠেকাতে কংগ্রেসের বড় পদক্ষেপ এই ইশতেহার।

তবে একটি চরম বাস্তবতা হলো— রাজনৈতিক দলের এই ইশতেহারকে ভোটাররা অনেক সময় গুরুত্বের সঙ্গে নেন না, আবার সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলোও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কিন্তু রাহুল গান্ধীর ইশতেহারকে ভিন্নভাবে নেওয়া উচিত হবে না।

শুধু ইশতেহার নয়, বিশ্লেষকদের মতে— হঠাত্ করেই প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর রাজনীতিতে আগমনও রাহুল গান্ধীর জন্য বড় ব্যাপার। তার আগমনে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে গতি বাড়বে। যদিও অনেকের মতে, ভাই-বোনের এই প্রচারণা ও তত্পরতা ক্ষমতাসীন বিজেপি জোটকে হারাতে যথেষ্ট হবে না। তবে ২০১৪ সালে ভরাডুবির পর কংগ্রেসকে আজ যে আবস্থানে রাহুল গান্ধী নিয়ে এসেছেন তাতে তাকে আর কোনো দুর্বল প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবারও কোনো সুযোগ নেই। আর নির্বাচনের ফল যে, জরিপ অনুযায়ী হবে সেটাও ধরে নেওয়ার কোনো অবকাশ নেই।