সংখ্যাতাত্ত্বিক জনসংখ্যায় বাংলাদেশের ভার বাড়ছে। এতে বিপুল জনগোষ্ঠীর ব্যবস্থাপনাও ক্রমে কঠিন হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা থেকে শুরু করে মৌলিক সুবিধাদি নিশ্চিত করা যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি বেকারত্ব, সুশিক্ষা ও শৃঙ্খলার অভাব ক্রমেই প্রকট হচ্ছে। যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করাই এ মুহূর্তে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, কখনো কখনো এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হচ্ছে যা ‘হিউম্যানলি আনম্যানেজেবল’। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
অর্থনীতির মানদণ্ডে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ আজ মধ্য আয়ের সিঁড়িতে। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৯০৯ ডলারে। অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও এগোচ্ছে আকর্ষণীয় ভাবে। বিস্ময়কর অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশের খ্যাতি আজ বিশ্বজোড়া। আন্তর্জাতিক অর্থলগ্নী সংস্থাগুলোতো বলছে, বাংলাদেশের অগ্রগতি বিস্ময়কর।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ছয় অঙ্কের ঘরে থাকা প্রবৃদ্ধি এখন আট ছুঁই ছুঁই করছে। বাংলাদেশের আশা এবারে প্রবৃদ্ধির হার হবে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও বিশ্বব্যাংক বলছে, প্রবৃদ্ধি হবে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সবাই পাচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। আয় বাড়লে সঞ্চয় বাড়ার কথা। সেটি হচ্ছে না। তবে ভোগব্যয় বেড়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ এবং রফতানি আয় বাড়ায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ যথেষ্ট সন্তোষজনক। কারো কারো মতে, ৩২ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কারণ নেই। কেননা, এখনো বেশ চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে অর্থনীতি। দুর্বল ব্যাংকিং খাত, রফতানি বাণিজ্যে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারে আস্থার অভাব এই মুহূর্তে অর্থনীতিতে বড় সমস্যা। মেগা প্রজেক্টের গতিও শ্লথ হয়ে পড়েছে। কর্মসংস্থানের অভাব, শিল্পে প্রবৃদ্ধি কমে গেলে প্রবৃদ্ধি নিয়ে শঙ্কা আছে। জ্বালানি সঙ্কট, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থার বিষয়টিও নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তুলেছে।
এ অবস্থায় অগ্রসরমান অর্থনীতির সুফল সঠিক ভাবে মিলছে না। বিশাল জনগোষ্ঠীর চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সবার চাহিদা মিটিয়ে আয়ের সাথে ব্যয়ের সঙ্কুলানে ঘাটতি হচ্ছে। অন্যান্য বছরের মতো চলতি বছরেও তাই ৪ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার ঘোষিত বাজেট কাটছাঁট করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাধারণত বার্ষিক ব্যয় পরিকল্পনায় নানা কিছু বিবেচনায় থাকলেও প্রাক্কলিত আয়ের ঘাটতি থাকলে ব্যয় কাঠামোয় পরিবর্তন আনা হয়। তথাপি বাংলাদেশ যেভাবে এগোচ্ছে কিছু ‘অব্যবস্থাপনা’র কারণে অনেক কিছুই দৃশ্যমান হচ্ছে না। কিংবা সরাসরি সুফল মিলছে না। এরমধ্যে অন্যতম প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জনসংখ্যা। বাংলাদেশের মতো ছোট ভূখণ্ডে যত মানুষের বসবাস, তাতে সঠিক ব্যবস্থাপনা কঠিনই বটে। দেশের অর্থনীতি যদিও এগোচ্ছে, তথাপি উত্থান-পতনের কারণে জনবহুল দেশটির জন্য ঝুঁকি রয়েই যাচ্ছে। তাদের মতে, অর্থনীতি এখনো রেমিট্যান্স নির্ভর। এই আয়ের গতি প্রবাহে বিঘ্ন ঘটলে বড় ধরনের চাপে পড়বে অর্থনীতি।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী ইত্তেফাককে বলেন, জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে হবে। অর্থনীতি এগোলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে এবং কর্মসংস্থানও বাড়বে সেটি যেমন ঠিক, তেমনি আমাদের জনসংখ্যার আধিক্যের কারণে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ করতে হবে। পাশাপাশি স্বকর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য উদ্যোক্তা অর্থনীতির বিকাশ সাধন জরুরি। কারণ, প্রতি বছর যে হারে কর্মসংস্থানের চাহিদা বাড়ছে তা সামাল দিতে উদ্যোক্তা তৈরির কর্মসূচি নিতে হবে। যুবকের মধ্যে চাকরির মানসিকতার বদলে চাকরি দেওয়ার মানসিকতা গড়তে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নচেত্ মধ্য আয়ের ‘ফাঁদে’ আটকে যেতে পারে অর্থনীতি।
