নিমতলী, চকবাজার, বনানী এবং অতঃপর

আপডেট : ০৮ এপ্রিল ২০১৯, ২১:৩৫

নাজমুল হোসেন

বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনা দিন দিন প্রকট আকার ধারণ করেই চলছে। বিভীষিকাময় এসব ঘটনায় দেশ-বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করছে। ২০১০ সালের ৩ জুন রাজধানীর নিমতলীর ৪৩/১ নবাবকাটরায় পাঁচতলা বাড়িতে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারায় ১২৩ জন আর আহত হয় কয়েকশ মানুষ। কেমিক্যাল গোডাউনের অতিদাহ্য রাসায়নিক পদার্থের কারণে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে সেদিন এমন লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। সেদিন কয়েক কোটি টাকার সম্পদের সাথে অসংখ্য তাজা প্রাণ পুড়ে অঙ্গার হয়।

কেমিক্যাল গোডাউন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হলে এমন দুর্ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। তারপরে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯-এ রাজধানী পুরান ঢাকার চকবাজারে আবারো একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে। এখানেও যেমন ঘনবসতি রয়েছে তেমনি রয়েছে কেমিক্যালের গোডাউন ও কারখানা। জানা যায় পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় চার হাজার কেমিক্যাল গোডাউন ও কারখানা রয়েছে। অথচ এসব বিস্ফোরক ও দাহ্যপদার্থ এখানকার আবাসিকদের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। উচ্চ আদালতের সরানোর নির্দেশ থাকলেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ওইসব গোডাউন ও কারখানার মালিকরা গড়িমসি করে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। পুরান ঢাকার চকবাজারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে শতাধিক লোকের মর্মান্তিক মৃত্যুর শোকের আবহ না কাটতেই ৩৮ দিন পর অর্থাত্ গত ২৮ মার্চ আরো এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বনানীর ২২ তলাবিশিষ্ট এফ আর টাওয়ারে কমপক্ষে ২৫ জনের মৃত্যু হয়। মৃতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাদের সাধ্যমত চেষ্টা করে পাঁচ ঘণ্টা পর আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন পুলিশ, নৌ, সেনা ও বিমানবাহিনীর সদস্যরা। অনেক মানুষকে অক্ষত, আশঙ্কাজনক ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে অনেকেই মারা যায়। আশপাশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষও এই উদ্ধারের মানবিক কাজে অংশ নিয়েছে।

অবাক হলে সত্য, বনানীর দুর্ঘটনার একদিন পরেই অর্থাত্ ৩০ মার্চ গুলশান-১ এর ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজারে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে আগুন লেগে কোনো হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও প্রায় দুই শতাধিক দোকান পুড়ে কয়েক কোটি টাকার ব্যাপক ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে। নৌ, বিমান, সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের ২০টি ইউনিট অক্লান্ত পরিশ্রম করে সকাল প্রায় আটটার দিকে আগুন নিভাতে সক্ষম হয়। অনেক পরিবার সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। অথচ ২০১৭ সালের জানুয়ারিতেও পুড়ে গিয়েছিল এই ডিএনসিসি মার্কেটের কাঁচাবাজার ও মার্কেটের একাংশ। সেই সময়ের ফায়ার সার্ভিসের দেওয়া সুপারিশও মানা হয়নি।

ইতিমধ্যে উভয় ঘটনায় তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। কিন্তু এই তদন্ত কমিটি করে বারবার কতটুকু ফলপ্রসূ সমাধান আসছে সেটাই বিবেচ্য বিষয়! প্রশ্ন থাকছে—অগ্নি নিরাপত্তা নিয়ে কেন এত উদাসীনতা? বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স নিরাপত্তার জন্য বড় বড় ইমারতগুলোতে কিছু নিয়ম-বিধি বেঁধে দিলেও সেগুলোর কোনো প্রয়োগ নেই। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও দুর্বলতার দিকেই এখন বারবার অভিযোগের তীর। দেখা যায় রাজধানীর প্রতিটি এলাকায় গায়ে গায়ে ঘেঁষে গড়ে উঠছে বহুতল ভবনবিশিষ্ট ইমারতগুলো। একেকটা বিল্ডিং থেকে অন্যটা যতখানি দূরত্বে থাকার কথা, তা নেই। অর্থ ও প্রভাবের জোরে পরিকল্পনাহীন ও নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগে গড়ে উঠছে এসব ভবন। ভবন নির্মাণে মানা হয়নি কোনো বিল্ডিং কোড। প্রায় বিল্ডিংগুলোতেই অগ্নি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। সিঁড়িপথ দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে নামাটাও কষ্টকর কারণ সর্বোচ্চ আড়াই থেকে তিন ফুট প্রস্থের সিঁড়ি রয়েছে ঐসব ভবনে। প্রতিটা বিল্ডিং-এ নেই পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা, নেই ফায়ার এক্সটিংগুইশার। আর থাকলেও সেটি পূর্ণ রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ পাউডারে।

এফ আর টাওয়ার নির্মাণে রাজউক অনুমোদন দিয়েছিল ১৮তলা পর্যন্ত। অথচ সেখানে অনুমোদনহীনভাবে ২২তলা পর্যন্ত করা হয়। সুউচ্চ এই ভবনে আটকা-পড়া অনেককেই উদ্ধার করতে হিমশিম খায় উদ্ধারকারী কর্মীরা। এত উঁচু ভবনে আগুন দ্রুত নিভানোর ও উদ্ধারের আধুনিক ব্যবস্থা অপ্রতুল হওয়ায় এত জানমালের ক্ষতি হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসব ভবন নির্মাণ করলেও দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের যে দ্রুততম ব্যবস্থা ফায়ার হাইড্র্যান্ট সেটাও আশপাশে নেই। অথচ অন্যান্য দেশে এই দ্রুততর ও কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় আগের মতো নেই ডোবা, পুকুর, জলাশয় বা নদ-নদী যেখান থেকে দ্রুতই পানি নিয়ে আসা যাবে প্রতিটি দুর্ঘটনাস্থলে। এইসব পানির উত্স ভরাট আর দখলের কবলে পড়াতে সমস্যা আরো বেড়েছে। তাছাড়া যে পরিমাণ যানজট সেটা উপেক্ষা করে দুর্ঘটনাস্থলে পানি নিয়ে আসতে আসতে সময় লেগে যাওয়ায় ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যায়।

আসলে আমাদের দেশে একটা ভয়াবহ ঘটনার পরই এটা যেন ব্যাধির মতো মহামারীর আকার ধারণ করে। ইদানিং সড়ক দুর্ঘটনা ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলো যেন একে অপরের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েই চলছে। যেখান থেকে মানুষ তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিক্ষা নেবে, সচেতন হবে—সেখানে সবাই উদাসীন। প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ হারায় সহায় সম্বল, কেউবা তার প্রিয়জন বা উভয়টিই হারায়। বারবার এরূপ ঘটনা ঘটার পরে কেন আমাদের বোধোদয় হচ্ছে না? যদি দোষীদের সনাক্ত করে কঠিন শাস্তির মাধ্যমে নজির সৃষ্টি করা যায় তাহলে হয়তো পরবর্তী দুর্ঘটনা ঘটাতে নতুন সম্ভাব্য দোষীরা নিরুত্সাহিত হবে।

দুর্ঘটনা মানেই তো অপ্রত্যাশিত ঘটনা। কিন্তু আমাদের তো প্রস্তুত থাকতে হবে। রাজউকের সততা, দক্ষতা ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কেন তাদের অবহেলা, অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের খেসারত দেবে নগরবাসী তাদের জানমালের বিনিময়ে? মাননীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেছেন, রাজধানীর অন্যান্য বহুতল ভবনের অগ্নি নিরাপত্তার ব্যবস্থা খতিয়ে দেখতে আগামী ১৫ দিন অভিযান চালানোর মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের সকল বড় বড় শহরেও সরকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে গড়ে ওঠা ভবনগুলোতে কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। এমন দুর্ঘটনার মোকাবিলা করতে আরো উন্নত প্রযুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে আগুন নেভানো সম্ভব হবে।

নতুন ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার আগে বিল্ডিং কোড, অগ্নি নিরাপত্তায় ফায়ার সার্ভিসের নিয়ম-নীতিসহ অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্ঘটনা একটি স্বাভাবিক বিষয় হয়ে ওঠার আগেই কঠিন ও কার্যকর সব ব্যবস্থা সরকারকেই নিতে হবে। এক্ষেত্রেও জিরো টলারেন্স নীতি সবার কাম্য। আমাদের উন্নয়ন ও নগরায়ণ চিন্তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন। প্রয়োজন নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সকল প্রকার ঝুঁকি থেকে নিরাপদে বসবাস করার উপাদানের সন্নিবেশ রাখা অতীব জরুরি। দেশে যেন অপঘাতে মৃত্যুর মিছিল চলছে। এটি প্রতিনিয়ত সরকার ও রাষ্ট্রকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। কথার চাতুর্যে কিংবা অন্যের ওপর দোষ দিয়ে পার পাওয়ার চেষ্টা কাম্য নয়।

n লেখক : প্রকৌশলী

[email protected]