মো. রাশেদ আহমেদ
আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ হিসেবে পরিচিতি। গ্রাম বাংলার সকল মানুষ কম বেশি কৃষি কাজের সঙ্গে জড়িত। আজো গ্রাম অঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ কৃষি কাজকে বুকে আগলে রেখে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখে। তবে সন্দেহ নেই যে, বর্তমান গ্রামের মানুষেরা দিন দিন কৃষি কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তারা এখন যান্ত্রিক জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
বর্তমানে মোট কৃষি পরিবারের সংখ্যা ১৫১৮৩১৮৩, যা অতীতের চেয়ে অনেক কম। এ তথ্য প্রমাণ করে কৃষি কাজের প্রতি আগ্রহ কতটা কমে গেছে! সাম্প্রতিককালের তথ্য অনুযায়ী মোট আবাদযোগ্য কৃষি জমির পরিমাণ ৮৫.৭৭ লক্ষ হেক্টর। মাত্র বছর দুয়েক আগে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ হেক্টরের কাছাকাছি।
অপরদিকে আবাদযোগ্য পতিত জমির পরিমাণ ২.২৩ লক্ষ হেক্টর যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থাত্ অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েছে। দেশে জনসংখ্যা যতই বাড়ছে ঠিক তার বিপরীতে ফসলি জমির পরিমাণ সংকীর্ণ হচ্ছে। যা খুবই হতাশাজনক। কারণ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে ও আগামীর চাহিদা মেটানোর জন্য কৃষি জমিতে ফসল উত্পাদনের বিকল্প কোনো পথ নেই।
১৯৯০ সালের দিকে কৃষিক্ষেত্রের উপর মোট জনশক্তির প্রায় ৭৫% নির্ভরশীল ছিল। যার ফলে মোট জনশক্তি এবং অর্থনীতি কৃষির উপর নির্ভরশীল ছিল। আর বর্তমান কৃষি কাজ নিয়োজিত জনশক্তির হার মাত্র ৪০.৬% অর্থাত্ কৃষি কাজে নির্ভরশীলতা কমেছে প্রায় দ্বিগুণ। যার পেছনে যথেষ্ট কারণও আছে।
প্রথমত, কৃষি খাত এখন লোকসান খাতে পরিণত হয়েছে, তারা নিজ হাতে ফসল উত্পাদন করার পরও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত। ফলে কৃষকেরা যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে তার চেয়ে লোকসানের সম্মুখীন হয় বেশি। দ্বিতীয়ত কৃষি কাজ আজো অনেক বেশি কায়িক শ্রমের উপর নির্ভরশীল। তৃতীয়ত, ফসলি জমির উপর শিল্পকারখানা স্থাপন। চতুর্থত, আবাদি জমির উপর ইট ভাটা তৈরি। পঞ্চমত, উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত জমির পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। ষষ্ঠত, জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এছাড়াও জলবায়ুগত পরিবর্তন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, খরা, অতিবৃষ্টি, জমির পরিমাণ কমে যাওয়াও অন্যতম কারণ। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ ছিল ০.২৮ একর আর বর্তমানে তা কমে এসে দাঁড়িয়েছে ০.২৫ একর।
জনসংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি জমি কমার যে সম্পৃক্ততা আছে তা অস্বীকার করা যায় না। প্রতিবছর জন্ম নিচ্ছে সাত হাজার নতুন মুখ এবং বছরে বৃদ্ধি পাচ্ছে ২৫ লাখ লোক। প্রতিদিন ২২০ হেক্টর চাষযোগ্য জমি হারিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিবছর হারিয়ে যাচ্ছে ৮০ হাজার ৩০০ হেক্টর জমি।
সাম্প্রতিককালে “খাদ্য নিরাপত্তা বিজ্ঞান” শীর্ষক এক সেমিনারের একটি গবেষণায় দেখা যায় যে জনসংখ্যা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে ২০২৫ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ১৯ কোটি, তখন খাদ্যের প্রয়োজন হবে তিন কোটি ১৫ লাখ মেট্রিক টন। আর ২০৫০ সালে জনসংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ কোটির বেশি। তখন খাদ্যের চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে চার কোটি ২৫ লাখ মেট্রিক টন। সেই সঙ্গে ২০২৫ সালে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমে দাঁড়াবে ৬৯ লাখ হেক্টর আর ২০৫০ সালে দাঁড়াবে মাত্র ৪৮ লাখ হেক্টর। সুতরাং, সন্দেহ নেই যে এই অল্প জমিতে ৪.২৫ কোটি মেট্রিক টন খাদ্যের চাহিদা পূরণ করা হবে খুবই দুঃসাধ্য। অধিক পরিমাণ খাদ্যের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রধানত দুইটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত উচ্চ ফলনশীল জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে যোগান নিশ্চিত করা। দ্বিতীয়ত বিরূপ পরিবেশের সঙ্গে কৃষিকে খাপ খাওয়ানোর মাধ্যমে ক্রমাগত উত্পাদন বৃদ্ধি করা। নিজের দেশে খাদ্যের চাহিদা পূরণ করে বিদেশে রপ্তানি করার মাধ্যমে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব যা অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিরাট ভূমিকা রাখবে।
যাইহোক, আমাদের প্রত্যাশা কৃষি, কৃষক ও শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষিত হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাকা আরো গতিশীল রাখতে ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করতে কৃষি উত্পাদনের কোনো বিকল্প নেই।
লেখক:শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়,
কুষ্টিয়া।
