বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে কতিপয় উশৃঙ্খল আচরণ করছে। গত শুক্রবার রাতে রামুতে রোহিঙ্গা যুবকের দায়ের কোপে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। অন্যদিকে বালুখালী ক্যাম্পে রোহিঙ্গাদের হামলায় ৫ জন আহত হয়েছে। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছে, বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটতে পারে। এখনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়নি। অন্যদিকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ এখনো বন্ধ হয়নি। প্রতিদিনই এক হাজার থেকে দুই হাজার রোহিঙ্গা আসছেই।
কক্সবাজার র্যাব-৭ এর কোম্পানি কমান্ডার মেজর মো. রুহুল আমিন ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, গত শুক্রবার রাত ১২টার দিকে বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মসজিদের মাইকে ডাকাত ঢুকেছে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। এ খবর শোনার পর একদল রোহিঙ্গা পাঁচজন টিউবওয়েল শ্রমিকের উপর হামলা চালায়। এ সময় হামলায় দুইজন মারাত্মক আহত হয়। র্যাব ইলিয়াছ (২৫) ও নুরুল বশর (২৬) নামে দুই রোহিঙ্গাকে আটক করেছে। তাদের কাছ থেকে দুটি এলজি, দুই রাউন্ড কার্তুজ ও চার রাউন্ড ব্যবহূত গুলির খোসা পাওয়া গেছে।
কুতুপালং কাম্পের রফিক উদ্দিন নামে এক যুবককে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কুতুপালং ক্যাম্প পুলিশের ইনচার্জ মো. শাখাওয়াত হোসেন।
অন্যদিকে রামু থানার ওসি মো. লিয়াকত আলী জানিয়েছেন, রোহিঙ্গা তরুণ জিয়াবুল হকের দায়ের কোপে আব্দুল জব্বার (৩৫) নামে এক বাংলাদেশি নিহত হয়েছে। গত শুক্রবার গভীর রাতে উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নে এঘটনা ঘটে।
খুনিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মাবুদ জানিয়েছেন, জিয়াবুল হেডম্যান পাড়ার শামসুল আলমের রোহিঙ্গা স্ত্রী দিলারা বেগমের দুঃসম্পর্কের ভাইয়ের ছেলে। নিহত আব্দুল জব্বারের সঙ্গে দিলারার পরকীয়া ছিল। দিলারার সঙ্গে আব্দুল জব্বারকে গোপনে কথা বলতে দেখে জিয়াবুল জব্বারকে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে আহত করলে হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যায়।
এদিকে রোহিঙ্গা স্রোত বাড়ার সাথে সাথে টেকনাফ ও উখিয়া হয়ে মিয়ানমার থেকে ইয়াবার চালান আসার পরিমাণও বেড়ে গেছে। রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসার পর থেকেই স্থানীয়ভাবে বেশকিছু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। গত এক মাসে টেকনাফ ও উখিয়ার পুলিশ রোহিঙ্গাদের মাধ্যমে সংঘটিত অন্তত ৩০টির মতো অপরাধের ঘটনা রেকর্ড করেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, অবৈধভাবে দোকান বসাতে না দেওয়া, বনের গাছ কাটতে বাধা দেয়া, জমি দখল করে ঘর তৈরিতে বাধা দেওয়াসহ নানা কারণে উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গারা উশৃঙ্খল আচরণ করছে।
উখিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ মো. আবুল খায়ের বলেন, এগুলো নিয়মিত ঘটনা। রোহিঙ্গাদের কারণে জনসংখ্যা বাড়ায় কিছু বাড়তি ঘটনা ঘটছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক পুলিশ কর্মকর্তা ইত্তেফাককে জানিয়েছেন, রোহিঙ্গাদের কারণে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে এটা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে।
টেকনাফের উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা জাহিদ হোসেন সিদ্দিক জানিয়েছেন- যানবাহনের ভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়া, কম মজুরিতে রোহিঙ্গাদের কাজে জড়ানোর কারণেও স্থানীয়দের সাথে রোহিঙ্গাদের কিছু বিরোধের ঘটনা ঘটছে।
জানতে চাইলে কক্সবাজার রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মাহমুদুল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, রোহিঙ্গাদের কারণে স্থানীয়রা নানা সমস্যায় পড়ছেন। তারা উশৃঙ্খল আচরণ করতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের সাথে সংঘাতে জড়াচ্ছে। সামনের দিকে পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কমিটির উপদেষ্টা আদিল চৌধুরী বলেন, রোহিঙ্গাদের সংরক্ষিত এলাকার মধ্যেই রাখতে হবে। বাইরে অবাধে বিচরণের সুযোগ দিলেই বিপদ। তাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেয়াই একমাত্র সমাধান।
রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ এখনো থামেনি
সহিংসতা এড়াতে গণহারে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ এখনো থামেনি। গতকাল শনিবারও সীমান্তে পেরিয়ে বাংলাদেশে এসেছে রোহিঙ্গারা। যদিও রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ বন্ধে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকার ‘চুক্তি স্বাক্ষর’ করেছে। খবর বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের।
দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল গতকাল বার্তা সংস্থা ইএফই’কে বলেছেন, আমি এখনো দেখছি না, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ হয়েছে। সাধারণত এক হাজার থেকে দুই হাজার রোহিঙ্গা প্রতিদিনই বাংলাদেশে আসছে। রোহিঙ্গা প্রবেশ স্থিমিত হয়েছে, এমনকি তাও আমরা বলতে পারছি না। শুক্রবার বাংলাদেশে কমপক্ষে ৫০০ রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। ‘চুক্তির’ পরেও রোহিঙ্গা প্রবেশের ক্ষেত্রে আমরা কোনো পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি না।
জাতিসংঘের আন্ত:খাত সমন্বয় গ্রুপের শুক্রবারের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত দুই মাসে প্রায় ৬ লাখ ৫ হাজার রোহিঙ্গা প্রবেশ করেছে। এদিকে, রাখাইনে বাস্তুহারা রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমার সরকারের পুনর্বাসন পরিকল্পনায় জাতিসংঘ সহযোগিতা করছে বলে খবর দিয়েছিল মিয়ানমার সরকারের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম। গতকাল ওই সংবাদমাধ্যম খবরটি সংশোধন করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে জন্মনিয়ন্ত্রণ রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও বাস্তবে তা কাজে আসছে না। রোহিঙ্গা নারী ও পুরষরা জন্মনিয়ন্ত্রণ রোধে ব্যবস্থা নিতে আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
ইত্তেফাক/আনিসুর
