আন্তঃবিভাগীয় তথ্য বিনিময় ও একটি প্রস্তাবনা

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:০৩

এ টি এম আবু আসাদ

তথ্যপ্রযুক্তির চরম উত্কর্ষতার সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিজীবনের গোপনীয়তা রক্ষার ধারণারও পরিবর্তন হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা ও উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনে প্রতিটি নাগরিকের তথ্য রাষ্ট্রের কাছে থাকা চাই। রাষ্ট্রের এ প্রয়োজন পূরণে সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাদের ক্লায়েন্ট বা স্টেকহোল্ডারদের ডাটাবেজ তৈরি করছে। যেমন পুলিশের কাছে আছে ক্রিমিনালদের ডাটাবেজ, স্থানীয় সরকার বিভাগের আছে জন্ম নিবন্ধন ডাটাবেজ, ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাংকের হিসাবধারীদের ডাটাবেজ, বিআরটিএ কর্তৃপক্ষের কাছে আছে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও গাড়ির মালিকদের ডাটাবেজ, পাসপোর্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আছে পাসপোর্টধারী বাংলাদেশি ও ভিসাপ্রাপ্ত বিদেশিদের ডাটাবেজ, হজ মন্ত্রণালয়ের আছে হাজি বা হজে গমনেচ্ছুদের ডাটাবেজ, এনবিআর-এর আছে আয়কর প্রদানকারীদের ডাটাবেজ। সর্বোপরি জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগের কাছে আছে এনআইডি বাহকদের ডাটাবেজ।

দাপ্তরিক/সরকারি প্রয়োজনে আবার এক বিভাগের তথ্য অন্য বিভাগের প্রয়োজন হয়। তখন পত্র দিয়ে এক বিভাগ আরেক বিভাগের কাছে তথ্য চায়। অনেক সময় কোনো কোনো কর্তৃপক্ষ অপর বিভাগের ডাটাবেজ প্রবেশাধিকার চায়, যাতে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্য দেখে নিতে পারে। এভাবে এক বিভাগের প্রয়োজনে আরেক বিভাগের ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার চাওয়াটা কতটুকু যৌক্তিক বা নিরাপদ? এভাবে ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার প্রদান করতে এক বিভাগের সঙ্গে অপর একাধিক বিভাগের নেটওয়ার্ক স্থাপন দরকার হবে।

পুলিশ বিভাগের দরকার হতে পারে সকল বিভাগের ডাটাবেজে প্রবেশাধিকার। দুর্নীতি দমন কমিশনের যদি দুর্নীতিবাজদের কোনো ডাটাবেজ থাকে তবে এতে পুলিশ বিভাগের প্রবেশাধিকার দরকার হতে পারে। একইভাবে পুলিশ বিভাগের দরকার হতে পারে ড্রাইভিং লাইসেন্স যাচাই এর জন্য বিআরটিএ-এর ডাটাবেজের প্রবেশাধিকার, চাকরি প্রার্থীদের তদন্তকালে সনদ যাচাই-এর জন্য শিক্ষাবোর্ডের ডাটাবেজের প্রবেশাধিকার, কোনো বিশেষ পাসপোর্টধারীকে বিমানবন্দরে আটক করার জন্য পাসপোর্টের ডাটাবেজের প্রবেশাধিকার ইত্যাদি। আবার বিমান কর্তৃপক্ষ চাইতে পারে পুলিশ বিভাগে সংরক্ষিত ক্রিমিনাল ডাটাবেজের প্রবেশাধিকার যাতে বিমান ছিনতাইয়ের ঝুঁকি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। এভাবে এক দপ্তরের ডাটাবেজে অন্য দপ্তরে প্রবেশের চাহিদার তালিকা দীর্ঘ হতে পারে। এটা মোটেও বাস্তবসম্মত নয়।

বর্তমানে সরকারি বিভাগগুলো ডিজিটালাইজ্ড হওয়ার ক্ষেত্রে নিজস্ব পন্থায় সিস্টেম ডেভেলপ করছে এবং প্রতিটি সিস্টেমই অন্য সিস্টেম হতে আলাদা। চাহিদামতো বিভিন্ন বিভাগের সঙ্গে ডাটা শেয়ারিং করার ক্ষেত্রে Many-to-many রিলেশনশিপের মতো একটি জটিল প্রক্রিয়ার উদ্ভব হচ্ছে। Many-to-many  রিলেশনশিপ প্রক্রিয়ার ডাটা শেয়ারিং-এর ক্ষেত্রে নিম্নবর্ণিত সমস্যা তৈরি হয়:

(ক) কোনো বিভাগের একটি সার্ভার বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক একইসঙ্গে ব্যবহার করলে তা ধীরগতি সম্পন্ন হয়। এজন্য সার্ভার ব্যবহার উপযোগী রাখতে প্রতিনিয়ত একটি বিভাগের সঙ্গে ইন্টিগ্রেশনের পর সার্ভার ক্যাপাাসিটি আপগ্রেডেশনের প্রয়োজন পড়ে। এতে সার্ভারের কম ক্ষমতাসম্পন্ন যন্ত্রাংশ ব্যবহার উপযোগী থাকা সত্ত্বেও তা পরিবর্তন করে উচ্চক্ষমতা সম্পন্ন যন্ত্রাংশ স্থাপনের প্রয়োজন পড়ে বিধায় সরকারের অর্থের এবং টেকনিক্যাল রিসোর্সের অপচয় ঘটে। (খ) Many-to-many রিলেশনশিপ/কানেক্টিভিটির ফলে সিস্টেম একটি জটিল আকার ধারণ করে, যার মেইনটেন্যান্স ব্যয়বহুল। তাছাড়া একটি বিভাগকে বিভিন্ন বিভাগ কর্তৃক রিকোয়েস্টের জবাব দিতে টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের সদা ব্যস্ত থাকতে  হয়।

(গ) একটি সার্ভার প্রয়োজনের তুলনায় বেশি User  ব্যবহার করায় User Management System এবং Server Operating system এ বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়।

(ঘ) একটি সার্ভার একাধিক বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক ব্যবহার হওয়ায় তথ্যের সঠিক ব্যবহার এবং সার্ভারের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ার সম্ভাবনা থাকে। তথ্য শেয়ারের নিমিত্ত রাষ্ট্রের থাকতে হবে একটি কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ। এক্ষেত্রে ‘ইনফরমেশন শেয়ারিং হাব’ হিসেবে সংগত কারণেই জাতীয় পরিচয়পত্র অণুবিভাগকে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে ব্যক্তিবিশেষের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যের মধ্যে পাসপোর্ট নম্বর, ড্রাইভিং লাইসেন্স, হেল্থ কার্ড নম্বর, ব্যাংক হিসাব, টিআইএন নম্বর ইত্যাদি তথ্য থাকতে পারে। পুলিশ বিভাগসহ অন্যান্য গোয়েন্দা বিভাগ বা সরকারের অন্যান্য বিভাগের প্রয়োজনে ব্যক্তিবিশেষের যে কোনো তথ্য এনআইডি-এর কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ থেকে গ্রহণ করা যেতে পারে। এতে সকল জটিলতার অবসান ঘটবে বলে আশা করা যায়।

বর্তমানে যেহেতু ১৮ বছর বা পূর্ণ বয়সী নাগরিকের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে থাকে সেক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধনের সিস্টেমকে এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে যাতে কোনো নাগরিকের বয়স ১৮ বছর হবার সঙ্গে সঙ্গেই তার তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট হবে। এক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর একই হতে পারে, যদি না সকল বয়সের বাংলাদেশি নাগরিকদের তথ্য জাতীয় পরিচয়পত্রের ডাটাবেজের আওতায় আসে। প্রস্তাবিত সিস্টেমে প্রতিটি বিভাগকে আলাদাভাবে একে অন্যের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করার পরিবর্তে কেবল জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করলেই  One-to-many রিলেশনশিপ/ কানেক্টিভিটি তৈরি হবে, যা সহজেই ব্যবস্থাপনাযোগ্য, সাশ্রয়ী এবং নিরাপদ। এই প্রক্রিয়ায় ডাটা ইউনিফরমিনিট বজায় থাকবে এবং টেকনিক্যাল রিসোর্স সাশ্রয় হবে।

n লেখক : অতিরিক্ত মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব), বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর