সালমা আহেমদ ও আব্দুল্লাহ আল মাছুম
আমাদের ছোটবেলা কেটেছে ‘মীনা’ কার্টুন দেখে। বিভিন্ন পর্বে দেখা মীনার নানা কার্যকলাপ এখনো অবচেতন মনে নাড়া দেয়। সাহস জোগায়, আত্নবিশ্বাস বাড়ায়, সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে। বিভিন্ন জটিল পরিস্থিতিতে সেই ছোটবেলায় দেখা মীনার একটি উক্তি আজও আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। মীনা বলেছিল, ‘আমরা একসাথে ওগো মুখোমুখি হইলে ওরা আর ক্ষ্যাপাইতে সাহস পাইবো না’। ইভটিজিংয়ের মোকাবিলা সম্পর্কিত একটি পর্বে মীনা এমন উক্তি করেছিল। সেই পর্বে বখাটেরা স্কুলপড়ুয়া মেয়েদের পথ আগলে ইভটিজিং করত।
সেই ছোটবেলায় দেখা কার্টুন চরিত্র মনের মধ্যে অনুকরণীয় আদর্শ (মডেল) হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে— তা এখন বুঝছি। সেই আদর্শ আমাদেরকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাবিত করছে। আমরা না চাইলেও সে তার কাজ করছে। আমাদের ছোটবেলায় অবুঝ মননে যেভাবে ‘আদর্শ’ সৃষ্টি হয়েছে, ঠিক সে প্রক্রিয়াতেই তো এখনকার শিশুদের মধ্যেও ‘আদর্শ’ তৈরি হচ্ছে। আমরা যেমনি সে প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছি না, তেমনি আজকের শিশুরাও পরিণত বয়সে কার্টুন থেকে নেওয়া তাদের ‘আদশর্’ চরিত্রের প্রভাবে আক্রান্ত হবে। কিন্তু ভাবনার বিষয় হচ্ছে, আমরা কী দেখে বড় হয়েছি আর এখনকার শিশুরা কী দেখে বড় হচ্ছে।
আমাদের সময়ের মীনা এখন আর নেই। সে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ‘বেন টেনিসন’, ‘গোয়েন’ বা ‘পাওয়ার পাফ গার্লস’ হয়ে গেছে। এখনকার শিশুরা তো তাই দেখে বড় হচ্ছে। তারা মীনাকে চিনে না। তারা বিধ্বংসী কার্টুন ‘বেন ১০’-এর বেন টেনিসন ও গোয়েন টেনিসনকে চিনে । বৈজ্ঞানিক ভুলে তৈরি হওয়া সুপার পাওয়ারের অধিকারী ‘পাওয়ার পাফ গার্লস’-এর তিন বোনকে চিনে এখনকার শিশুরা। এসব কার্টুন চরিত্রের মূল চালিকা শক্তি হচ্ছে ‘সহিংসতা’ দেখানো। দেখানো হচ্ছে ইতিবাচকভাবে। শিশুরা এসব দেখেই বড় হচ্ছে।
আমাদের সময়ের মীনাও সমস্যায় পড়ত। সমস্যার সমাধানে তার অস্ত্র ছিল সুবুদ্ধি, আত্নবিশ্বাস, নেতৃত্ব, জনসচেতনতা তৈরি ও ভালোবাসা। বর্তমান বেন, গোয়েন, কেভিন, পাওয়ার পাফ গার্লস্রাও সমস্যায় পড়ে। তবে তাদের মীনার মতো এত ধৈর্য নেই। যে সমস্যাই আসুক না কেন তার একমাত্র সমাধান একই কৌশলে ‘ধ্বংস’ করা। সব ভেঙে তছনছ করে, জ্বালাও-পোড়াও করে সমাধান করাই তাদের কাজ। এসব করতে তারা আগ্নেয়াস্ত্র ও ভবিষ্যত মরণাস্ত্রের ব্যবহার করে। ইভটিজিংয়ের মোকাবিলা সম্পর্কিত সে পর্বে মীনা দীপুকে খুন করে ফেলেনি। পর্বটি শেষ হয়েছে দীপুর আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে।
আমাদের শিশুদের চিন্তা-চেতনা কেমন করে ভয়াবহ আগ্রাসী থাবার শিকার হচ্ছে তা মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক আলবার্ট বান্দুরার ‘সামাজিক শিক্ষণ’ তত্ত্বে স্পষ্ট। তার মতে, মানুষ বিশেষ করে শিশুরা সামাজিক প্রেক্ষাপটে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি, আচরণ, আবেগীয় প্রতিক্রিয়া পর্যবেক্ষণ ও পরে অনুকরণের (মডেলিং) মাধ্যমে নতুন আচরণ শিখে থাকে। শিশুরা যদি সুস্থ, মার্জিত ও মানবিক আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তাহলে তা অনুকরণ করে ভালো আচরণ শিখবে। অন্যদিকে ঝগড়া-বিবাদ, আগ্রাসী আচরণ ও সহিংসতা দেখে তা অনুকরণ করে শিশুরা অনুরূপ আচরণই শিখবে। শিশুরা পর্যবেক্ষণ করে নতুন আচরণ শেখার জন্য প্রথমে অবচেতনভাবেই ‘আদর্শ’ (মডেল) তৈরি করে। এই প্রতীকী আদর্শ তৈরি হয় প্রধানত গণমাধ্যমে দেখা আধেয়ের চরিত্র থেকে। আমরা যেমন মীনাকে মনে ঠাঁই দিয়েছি, তেমনি বর্তমান শিশুরা ঠাঁই দিচ্ছে গোয়েনকে। আমরা প্রতীকী আদর্শ থেকে শিখেছি ধৈর্য ধরতে। এখনকার শিশুরা শিখছে ধ্বংস করতে। শিশুরা শিখছে প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়াই একমাত্র সমাধান। শিশুদের মনোজগত এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যত সমাজের আচরণ নিয়ে উদ্বিগ্ন হতেই হয়।
n লেখকদ্বয় যথাক্রমে সহকারী অধ্যাপক এবং শিক্ষার্থী, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
