রপ্তানি হচ্ছে ১২ দেশে!
মিলন রহমান, স্টাফ রিপোর্টার, বগুড়া
বগুড়ার কৃষকের ক্ষেতে ফলানো তোষা জাতীয় সোনালী আঁশ বা পাট থেকে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের সুতা। বাংলাদেশি এই পাটের সুতার অমিত সম্ভাবনার হাতছানি দেখা দিয়েছে বিশ্ববাজারে।
কৃষকের উত্পাদিত পাট একহাত ঘুরে যাচ্ছে বগুড়ার ‘নর্থ বেঙ্গল গোল্ডেন ফাইবার অ্যান্ড ডাইভারসিটি জুট মিলস লিমিটেড’ নামে একটি বিশেষায়িত পাটকলে। সেখানে তৈরি হচ্ছে বিশেষ ধরনের সুতা। দেশীয় পাটকলে তৈরি এই সুতা রপ্তানি হচ্ছে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া ও এশিয়ার ১০ থেকে ১২টি দেশে। দেশি পাটের সুতা রপ্তানি করে আয় হচ্ছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা।
পাট থেকে সুতা তৈরির বিশেষায়িত এই পাটকল স্থাপিত হয়েছে বগুড়া শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে তালোড়া রেলস্টেশন সংলগ্ন এলাকায়। উদ্যোক্তা সুভাষ প্রসাদ গ্রামীণ জনপদে এই পাটকল স্থাপন করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বর্তমানে কারখানায় পাট থেকে প্রায় ২০ ধরনের সুতা উত্পাদন করা হচ্ছে। এসব সুতা রপ্তানিকারকের মাধ্যমে সরাসরি পাঠানো হচ্ছে জাপান, চীন, উত্তর কোরিয়া, ইতালি, আমেরিকা, লন্ডন, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, জার্মানি, বেলজিয়ামসহ বিশ্বের ১০ থেকে ১২টি দেশে। কারখানাটিতে বর্তমানে কস সুতা উত্পাদন হলেও গড়ে প্রতিদিন ৫০ টন পর্যন্ত সুতা উত্পাদন সম্ভব হবে।’
তিনি জানান, কারখানায় উত্পাদিত এসব সুতার দাম বৈদেশিক বাজারে মানভেদে প্রতি পাউন্ড ৬০০ ডলার থেকে ৩২০০ ডলার পর্যন্ত। কৃষকের কাছ থেকে ২৪০০ থেকে ২৫০০ টাকা দরে পাট কেনা হয়। পাটের দাম বেশি হওয়ার কারণে উত্পাদন একটু কম হচ্ছে। পাট কারখানার এই সুতা বিদেশে পাঠানো ছাড়াও দেশেও নানা কাজে ব্যবহূত হচ্ছে।
সুভাস বলেন, ‘দেশি পাট থেকে তৈরি সুতার বিশ্ববাজারে প্রচুর চাহিদা রয়েছে। জাপানে টাটামি সুতার কদর অন্যরকম। বেলজিয়ামে রয়েছে কালার কোটেড সুতার চাহিদা। প্রতিমাসে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশে এখন গড়ে আট থেকে ১০ কন্টেনার সুতার চালান পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু গ্যাস সংযোগ না থাকায় উত্পাদন খরচ বেশি পড়া, কাঁচামাল ও দক্ষ শ্রমিকের সংকটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বৈদেশিক বাজারে পর্যাপ্ত সুতা রপ্তানি সম্ভব হচ্ছে না।’
স্থানীয় রসুলপুর গ্রামের শ্রমিক আরফান আলী বলেন, ‘দিনমজুরি দিতাম। বছরের ছয় মাস হাতে কাজ থাকতো না। ঘরে বেকার বসে থাকতে হতো। এখন কারখানায় সারাবছর সুতা তৈরির কাজ করছি। মাসে ১২ হাজার টাকা উপার্জন করছি। সংসারে অভাব নেই।’
মার্জিয়া আকতার বলেন, মা ফাতেমা বেগম এবং তিনি চারমাস আগে কাজের সন্ধানে বগুড়ায় এসে এই কারখানায় কাজ নেন। দুজন মিলে এখন মাসে প্রায় ১২ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছেন। থাকা-খাওয়া খরচ মিটিয়েও মা-মেয়ে মিলে কিছু টাকা মাস শেষে তারা সঞ্চয় করছেন। তাদের মতো রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী থেকে আসা অনেক অসহায় নারী এই কারখানায় কাজের সুযোগ পেয়েছেন।
বগুড়া চেম্বার ও কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহ-সভাপতি মাহফুজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্রিটিশ আমল থেকেই বগুড়ার পরিচিতি ছিল শিল্পনগরী হিসেবে। জেলার আনাচে-কানাচে গড়ে উঠছে বড় বড় কলকারখানা। এরই ধারাবাহিকতায় ২৪টি পাটকল গড়ে উঠেছে এখানে। শুধু শহরেই নয়, শিল্পায়ন হচ্ছে গ্রামাঞ্চলেও। বিপুল অঙ্কের পুঁজি বিনিয়োগের কারণে এখানকার অর্থনীতিও এখন বেশ চাঙা। বর্তমানে স্থানীয় শিল্পকারখানায় উত্পাদিত পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় দেড়শ কোটি মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হচ্ছে।’
