রায়পুরার দুর্গম চরাঞ্চলের মির্জারচর ও বাঁশগাড়িতে আওয়ামী লীগের বিবদমান দুই গ্রুপের লাঠিয়ালরা একে অপরের এলাকায় হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর করেছে। ভাংচুর হয়েছে কমবেশী সাড়ে ৫শত বাড়িঘর। সবচেয়ে বড় হামলা ও পাল্টা হামলা সংঘটিত হয়েছে মির্জারচর ইউনিয়নে।
গত শনিবার দুপুর থেকে শুরু হয়ে আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত উভয় পক্ষের হামলা পাল্টা হামলায় ইউনিয়নের মির্জারচর, কান্দাপাড়া ও বালুচর গ্রামে কমবেশী ৫শত বাড়িঘরে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। হামলা চলাকালে উভয় পক্ষে কমবেশি ১০ ব্যক্তি আহত হয়েছে। এদের মধ্যে ইকবাল (৩০) ও রজব আলী (২৮) নামে ২ জনকে সংকটাপন্ন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। এদের দুই জনই পরাজিত চেয়ারম্যান ফারুকুল ইসলাম সমর্থক বলে জানা গেছে। ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত কমবেশি ২শত পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। তারা এখন চরাঞ্চলের খোলা আকাশের নিচে অবস্থান নিয়েছেন।
স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী জাফর ইকবাল মানিক ও ফারুকুল ইসলামের সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে দ্বন্দ্ব-কলহ চলে আসছে। নির্বাচনী এই বৈরীতাকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই মির্জারচরে ছোটবড় কমবেশী ৪টি সংর্ঘষ হয়েছে। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধে রায়পুরা থানায় মামলা হয়েছে কমবেশি ৯টি। সর্বশেষ সংঘর্ষ হয়েছে গত ১৪ অক্টোবর। সেদিনের সংঘর্ষে আহত হয় প্রায় ১০ জন। এর মধ্যে নরসিংদী সদর হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় পরাজিত চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ফারুকুল ইসলাম ও তার সহযোগী অপু। এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করতে থাকে।
গত শনিবার দুপুরে ফারুকের সমর্থকরা জনৈক মাঈন উদ্দিনের নেতৃত্বে চেয়ারম্যান মানিকের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এতে ৪২টি বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই ঘটনার পর চেয়ারম্যান মানিকের সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়। তারা পার্শবর্তী ইউনিয়ন বাশগাড়ী, চরমধুয়া, নিলক্ষা ও ব্রাহ্মণবাড়ীয়া নবীনগর উপজেলার চরলাপাং থেকে কয়েকশত লাঠিয়াল ভাড়া করে এনে রাত সাড়ে ১০টার দিকে মির্জারচর ইউনিয়নের কান্দাপাড়া ও বালুচর গ্রামে হামলা চালায়। দীর্ঘ ৫ ঘণ্টাব্যাপী হামলা চলাকালে চেয়ারম্যান সমর্থক লাঠিয়াল বাহিনী তাণ্ডব চালিয়ে কমবেশি ৫শত বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে।
এব্যাপারে চেয়ারম্যান মানিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, যে ফারুকের সমর্থকরা বিনা উস্কানীতে শনিবার দুপুরে তার সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে ৪২টি বাড়িঘর ভাংচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে গ্রামবাসীরা ফারুকের লাঠিয়ালদের বিরুদ্ধে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এতে দুইপক্ষে সংঘর্ষ হয়। খবর পেয়ে নরসিংদী থেকে দাঙ্গা পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে লাঠিয়ালরা নিরাপদ দূরত্বে চলে যায়। এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সেখানে ব্যাপক সংখ্যক পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। তবে পুলিশ এ পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। এদিকে শনিবার রাতে বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের ৪টি গ্রামে তাণ্ডব চালিয়েছে সাহেদ সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী। একটি ভুল তথ্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই তাণ্ডবে ৩৫টি বাড়িঘর ভাংচুর ও লুটপাট হয়েছে। একটি বাড়িতে ঘটেছে অগ্নিসংযোগের ঘটনা।
জানা গেছে, ইউপি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতা সাহেদ সরকার ও বর্তমান ইউপি চেয়ারম্যান সিরাজুল হক’র সমর্থকদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এই ঘটনা নিয়ে কিছুদিন পূর্বে সাহেদ সরকার গ্রেফতার হয়ে মাসাধিককাল কারাভোগ করে মুক্তি পায়। গত শনিবার রাতে মাঈন উদ্দিন নামে তার এক সমর্থকের বাড়িতে বসে সাহেদ সরকারের লাঠিয়ালরা গোপন সভা করছিল। এ সময় তাদের একটি গ্রুপ অপপ্রচার চালায় যে, মাঈন উদ্দিনের বাড়িঘর সিরাজুল হকের সমর্থকরা ঘিরে ফেলেছে, যেকোন সময়ই হামলা হতে পারে। এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর রাত ৮টা থেকে সাহেদ সরকারের সমর্থকরা বটতলিকান্দী, বালুয়াকান্দী, চরমেঘনা ও দিঘলিয়াকান্দী ও নতুনবাজার এলাকায় ব্যাপকভাবে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটাতে থাকে। এসময় এলাকায় ব্যাপক আতঙ্কের সৃষ্টি হয়ে মানুষ নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। এই সুযোগ নিয়ে সাহেদ সরকারের লাঠিয়ালরা উল্লেখিত গ্রামগুলোতে সিরাজুল হকের বাড়িঘরে হামলা চালিয়ে প্রায় অর্ধশত বাড়ি এবং ৫টি দোকান ভাংচুর ও লুটপাট করে।
ইত্তেফাক/এমআই
