অধ্যক্ষের নির্দেশেই নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করে নুরুদ্দিন

আপডেট : ০৯ এপ্রিল ২০১৯, ২২:৫০

জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকা মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সোনাগাজী ইসলামীয়া ফাজিল মাদ্রাসার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুদ্দিন। হত্যার নির্দেশ দেন মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌল্লা। তার বিরুদ্ধে দায়ের করা নারী নির্যাতন দমন আইনের মামলা ও বক্তব্য প্রত্যাহারে রাজি না হওয়ায় নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনার দিন পরিকল্পিতভাবে নুসরাতকে ডেকে নেওয়া মাদ্রাসার ছাদে। কিন্তু ভয়ভীতির মুখেও নুসরাত মামলা প্রত্যাহারে রাজি হননি। ভাগ্যক্রমে নুসরাত বেঁচে গেলেও নুসরাত সর্ম্পকে অপপ্রচার করাসহ মাদ্রাসার     অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌল্লা’র মুক্তির দাবিতে মিছিল মিটিং করে এই নুরুদ্দিন। নুরুদ্দিনকে গ্রেফতার করতে পারলে হত্যা পরিকল্পনাসহ সবকিছু জানতে পারবে পুলিশ-এমনটা দাবি করছেন নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান এবং বাবা একেএম মুসা।

গতকাল মঙ্গলবার নুসরাতে মা-বাবা ও ভাইয়ের সঙ্গে ইত্তেফাকের এই প্রতিনিধির কথা হয়। নুসরাতের ভাই জানিয়েছেন, যেদিন তার বোনের শরীরে আগুন দেওয়া হয় সেদিন হাসপাতালে নেয়ার সময় নুসরাত তাকে সবকিছু জানিয়েছে।

এদিকে পুলিশ সদর দফতর নুসরাত জাহান রাফির শরীরে আগুন দেওয়ার ঘটনা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানিয়েছে, তারা যেসব তথ্য উপাত্ত পেয়েছে তাতে এই হত্যার চেষ্টা পরিকল্পিত বলে প্রমাণ পেয়েছে।  হত্যাচেষ্টায় নুরুদ্দিন ওতোপ্রোতভাবে জড়িত বলেও প্রমাণ পেয়েছে পুলিশ সদর দফতর। পুলিশের আইজি জাবেদ পাটোয়ারী নুরুদ্দিনকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে পুলিশের আইজি জাবেদ পাটোয়ারী ইত্তেফাককে বলেন, অপরাধী যেই হোক না কেউ ছাড় পাবে না। এ ঘটনার প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে সব ধরনের তথ্য উপাত্ত তদন্তে থাকবে। আর যাতে কেউ এ ধরনের অপকর্ম না করে সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদানে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে দগ্ধ নুসরাতের ভাই নোমান জানান, নোমান ওই মাদ্রাসা থেকে এবার ফাজিল পরীক্ষা দিয়েছে। ওই মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নুরুদ্দিন। নুরুদ্দিনের সঙ্গে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌল্লা’র গভীর সর্ম্পক রয়েছে।

নোমান আরো বলেন, গত ২৭ মার্চ নুসরাতের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করেন অধ্যক্ষ। নুসরাত বিষয়টি বাসায় জানালে তাদের মা সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। ওই মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সোনাগাজী থানা পুলিশ অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌল্লাকে গ্রেফতার করে। নুরুদ্দিন অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌল্লা’র মুক্তির দাবিতে মিছিল মিটিং করে। পরে মামলা থেকে অধ্যক্ষকে বাঁচাতে অধ্যক্ষের নির্দেশে নুরদ্দিন এ হত্যা পরিকল্পনা করে।

নোমান বলেন, অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের পর বোনের নিরাপত্তার স্বার্থে মাদ্রাসায় আনা নেওয়া করেন। ঘটনার আগের দুইটি পরীক্ষার সময়ও তিনি পরীক্ষা কেন্দ্রে তার বোনকে বসিয়ে দিয়ে এসেছেন। তবে ঘটনার দিন তিনি তার বোনকে নিয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢুকতে চাইলে মাদ্রাসার অফিস সহকারী মোস্তফা তাকে ঢুকতে দেননি। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী তার বোন পরীক্ষা কেন্দ্রে ঢোকার পর একটা সময় তাকে ছাদে ডে?কে নি?য়ে যাওয়?া হয়।

নোমান জানান, ছাদে যাওয়ার পর নেকাব, বোরকা, হাতমোজা প?রি?হিত চারজন নুসরাতকে অধ্যক্ষ এস এম সিরাজউদ্দৌল্লা’র বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার ক?রে নি?তে ব?লেন এবং অধ্যক্ষের বিরু?দ্ধে অভি?যোগ অসত্য এ কথা বল?তে চাপ দেন। তখন নুসরাত এতে অস্বীকৃ?তি জানা?লে ওই চারজন ওড়না দি?য়ে তার হাত বেঁধে ফেলেন। তার গ?া?য়ে তারা কিছু একটা ছুঁ?ড়ে দেন। তারপর শরীরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়ে ওই চারজন নুসরাতকে বলেন ‘যা এবার পালা।’ গা?য়ে আগুন লাগা অবস্থা?তেই নুসরাত দৌঁড়ে পালানোর চেষ্টা করে। চারজ?নের কেউ কারো নাম উচ্চারণ না কর?লেও কো?নো একপর্যা?য়ে একজন শম্পা ব?লে একজন?কে ডা?কেন। ত?বে তাদের সবার মুখ ঢাকা থাকায় কাউকে চিন?তে পা?রেন?নি নুসরাত। এক পর্যায়ে হাতবাঁধা ওড়নাটি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়ার পর নুসরাতের হাতের বাঁধন খুলে যায়। তখন নুসরাতের চিত্কার শুনে পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশের এক কনস্টেবল রাসেল ও মাদ্রাসার সেই অফিস সহকারী মোস্তফা সেখানে ছুটে যান। পরে তারা নুসরাতকে অন্য কাপড় দিয়ে জড়িয়ে ধরেন এতে আগুন নিভে যায়।

নোমান আরো বলেন, ঘটনার সময় ওই মাদ্রাসা থেকে কেউ বের হয়নি। কারণ হত্যার চেষ্টাকারী সকলেই ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। নোমান বলেন, নুরুদ্দিনকে গ্রেফতার করলে নুসরাতকে হত্যার চেষ্টার সব তথ্য বের হয়ে আসবে। তাকে দ্রুত গ্রেফতার করতে পারলে পুলিশ এ হত্যা চেষ্টার সকল পরিকল্পনাকারী ও নির্দেশেদাতাদের সম্পর্কে তথ্যও পাবে।

এদিকে পুলিশ সদর দফতর সূত্র জানায়, এ মামলাটি পুলিশের আইজি জাবেদ পাটোয়ারির নির্দেশে কঠোর ভাবে মনিটরিং করা হচ্ছে।

অপরদিকে গতকাল সকালে শেখ হাসিনা বার্ন এন্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইন্সস্টিটিউটের প্রকল্প পরিচালক এবং নুসরাতের মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালামসহ চিকিত্সক টিমের সিঙ্গাপুর  জেনারেল হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগরে প্রধান ডা. অং এর সঙ্গে এক ঘন্টা ভিডিও কনফারেন্স করেছে। ঐ সময় নুরসাতের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সা ব্যবস্থার বিস্তারিত ডা. অংকে জানানো হয়। সকল চিকিত্সা ব্যবস্থা জানার পর ডা. অং জানান, ঢাকার মেডিক্যাল বোর্ডেরে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে অপারেশন করার কথা সেটা যেন দ্রুত করা হয়। আর নুসরাতের চিকিত্সা যেভাবে চলছে তা সঠিকভাবে আছে বলে ডা. অং জানান। ডা. অং বলেন, নুসরাতের চিকিত্সার কোন পরিবর্তন করা হলে কিংবা কোন আপডেড থাকলে তাকে জেন জানান হয়। তবে তার শারীরিক এ অবস্থায় তাকে সিঙ্গাপুর নেয়া ঠিক হবে না বলে ডা. অং মেডিক্যাল বোর্ডকে জানান। ভিডিও কন্সপারেন্সের পর পরই মেডিক্যাল বোর্ড  নুসরাতে অপারেশন করে।

এ ব্যাপারে বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন সাংবাদিকদের জানান,  ওই ছাত্রীর অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় এখনই তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। পরে অবস্থার উন্নতি হলে তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। তিনি আরো বলেন, সিঙ্গাপুরের চিকিত্সকরা সব কাগজ ও রিপোর্ট দেখে বলেন যে, এ মুহূর্তে পাঁচ ঘণ্টা ফ্লাই করা ঝুঁকিপূর্ণ হবে এবং ফ্লাই করা ঠিক হবে না।