নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার কোল্ড স্টোরে সংরক্ষিত প্রায় ১৫ হাজার বস্তা আলুর বীজ পঁচে গিয়েছে। এ ঘটনায় প্রায় এক হাজার কৃষক দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। ফলে আগাম ও মৌসুমী আলু চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন আলু চাষীরা। এই বীজ আলুগুলো সংরক্ষণে ছিল রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার সিনহা স্পেশ্যালাইজড কোল্ড ষ্টোর।
পঁচে যাওয়া আলুর ক্ষতিপূরণ দাবী করে শতাধিক চাষী উপ-পরিচালক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুর ও তারাগঞ্জ উপজেলা কৃষি অফিসারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে।
অভিযোগ ও সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, আগাম আলুর সুতিকাগার হিসাবে খ্যাত নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলায় বীজ সংরক্ষণের জন্য হিমাগারে জায়গা না থাকায় আলু চাষীরা বিভিন্ন হিমাগারে বীজ আলু সংরক্ষণ করেন। এরমধ্যে প্রায় এক হাজার আলু চাষী ১৫ হাজার বস্তা বীজ আলু তারাগঞ্জ সিনহা স্পেশ্যালাইজড কোল্ড স্টোরে সংরক্ষণ করে। কিন্তু চাষীরা হিমাগার থেকে বীজ বের করে নিয়ে আসার সময় ৫০ভাগ আলুর বীজ পচে যায়। আর ৫০ভাগ আলুর বীজ জমিতে লাগানোর পর পচে যায় বলে চাষীরা অভিযোগ করেন।
IMG0
রবিবার দুপুর ১২টার দিকে সিনহা স্পেশ্যালাইজড কোল্ড স্টোরে গিয়ে দেখা যায় স্টোর থেকে পঁচা আলু বের করে কয়েকজন শ্রমিক অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছে। আবার স্টোরের পিছনের দিকে কয়েকজন নারী শ্রমিক পঁচা আলুগুলো বালু দিয়ে ঢেকে রাখছে। সাংবাদিক দেখে একজন নারী শ্রমিক বলেন, ভাই আপনি কিভাবে ভিতরে এলেন। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যান। না হলে আমাদের চাকরি চলে যাবে।
চাকরি যাবে কেন প্রশ্ন করলে ওই নারী শ্রমিক বলেন, আলু পঁচে যাওয়ার ছবি যাতে সাংবাদিকরা তুলতে না পারে সেজন্য সাংবাদিকদের ভিতরে ঢুকতে নিষেধ করেছেন রিফাত স্যার।
IMG1
নিতাই ইউনিয়নের মুশরুত পানিয়াল পুকুর গ্রামের আগাম আলু চাষী মজিদুল ইসলাম বলেন, আমি সিনহা কোল্ড স্টোরে ৫৫০ বস্তা বীজ আলু সংরক্ষণ করেছি। আগাম আলু লাগানোর জন্য হিমাগার থেকে ২০০ বস্তা বীজ বের করার জন্য রিসিভ কেটে আলু তুলতে গিয়ে দেখি আমার আলু পঁচে গেছে।
আলু পঁচে যাওয়ার বিষয়টি তাৎক্ষনিক ম্যানেজারকে জানালে তিনি বলেন, দু একটা আলু পঁচতে পারে। আলু বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মাটিতে ঢেলে দিলে আর পঁচবে না। ম্যানেজারের কথামতো আলু বাড়িতে নিয়ে এসে আলুর গাঁজা বের করার জন্য আলু মাটিতে ঢেলে রাখলে ৩০ শতাংশ আলু ও বাকীগুলো জমিতে লাগানোর পর পঁচে যায়। পরে বাজার থেকে চড়া মূল্যে বীজ কিনে জমিতে লাগাই।
উপজেলা সদরের আলু চাষী জামিনুর রহমান মানিক বলেন, আমি ওই হিমাগারে ৮৮৮বস্তা বীজ আলু রেখে ছিলাম। হিমাগারের মালিক কর্তৃপক্ষ ধারণ ক্ষমতার চেয়ে বেশী বীজ সংরক্ষণ করে। এছাড়াও অ-ব্যস্থাপনার কারণে আমার বীজ আলু ২৪৩ বস্তা পচে গেছে। আমি প্রতি বছর ১০০ থেকে ১১০ বস্তা আলু চাষাবাদ করি। বীজ পচে যাওয়ার কারণে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে পারি নাই।
বাহাগিলি ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ড সদস্য জনাব আলী বলেন, ওই স্টোরে আলু রেখে আমি সর্বশান্ত হয়ে গেছি। ১১০৩ নম্বর লটে আমি ৪৮ বস্তা আলু রেখেছিলাম আমার সব আলু পঁচে গেছে।
এ রকম ক্ষতিগ্রস্ত চাষী মুশরুত পানিয়াল পুকুর গ্রামের এনামুল হকের ৩৪ বস্তা, মজিদ মিয়ার ১৭ বস্তা, মশিয়ার রহমান ৩৬ বস্তা, শামীম মিয়ার ১০ বস্তা, বাহাগিলী ইউনিয়নের নয়ানখাল গ্রামের এমদাদুল হকের ৩৫ বস্তা, শফি মাহমুদের ১১ বস্তাসহ আরও অনেক চাষী তাদের বীজ আলু পঁচে যাওয়ার বিষয় অভিযোগ করেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিনহা স্পেশ্যালাইজড কোল্ড স্টোরের ম্যানেজারের দায়িত্বে থাকা (অফিস সহকারী) রিফাত হাসান বলেন, স্টোরে আলু পঁচবে এটাই স্বাভাবিক। তবে যেহুতু কৃষকরা পঁচে যাওয়া আলুর ক্ষতি পুরনের দাবিতে রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ও তারাগঞ্জ কৃষি অফিসারের কাছে অভিযোগ করেছে তারাই তদন্ত করে দেখুক।
তারাগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, কিশোরগঞ্জের আলু চাষীদের অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা এনামুল হক বলেন, এই উপজেলা আগাম আলু চাষাবাদের উপযোগী। প্রতি বছর ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষাবাদ করা হয়। কিন্তু এ বছর ৩ হাজার ৭৭ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষাবাদ করা হয়েছে। কৃষকের আলুর বীজ পচে যাওয়ায় চাষীরা ক্ষতির সম্মখীন হয়েছে।
ইত্তেফাক/নূহু
