ডিজিটাল ছোঁয়ায় বেদেরা

আপডেট : ২১ নভেম্বর ২০১৭, ১৩:৪৫
 
বেদে সম্প্রদায়ের পূর্বপুরুষেরা আজীবন ধরে বিভিন্ন নদ-নদীর পানিতে ভেসে ভেসে বেড়াতো। তারা যাযাবরের মতো জীবন যাপন করত। তাদের জন্ম, মৃত্যু ও বিয়ে তথা জীবন-যাপন জলের মাঝে থাকলেও এখন তারা ধীরে ধীরে ডাঙায় উঠে এসেছে। বেদে সম্প্রদায়ের প্রতিটি পরিবারে প্রায় ৩ থেকে ৪ জন ছেলে বা মেয়ে আছে। তারা অনেক সময় খেয়ে না খেয়ে থাকতো। করতো না স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেট ব্যবহার। ছিল না তাদের মাঝে কোন শিক্ষার আলো। এখন সেই বেদে সম্প্রদায়ের জীবন ধারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারা এখন ডিজিটালের ছোঁয়া পেয়েছে।
 
সরেজমিনে দেখা গেছে, জয়পুরহাটের কালাই পৌরসভার ধাপ মহল্লার সারপুকুর পাড়ে কয়েকজন বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ দেখা যায়। বেশ কয়েকদিন যাবত তাদের পরিবারকে নিয়ে সারপুকুর পাড়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। সেখানে তাদের রঙ-বেরঙের পলিথিনের মোড়ানো ছোট ছোট ঘরে এখন সৌর-বিদ্যুতের কল্যাণে আলো জ্বলছে। তাদের ঘরের আশপাশে সোলার প্লান্ট স্থাপন করা। ঘরে সৌর-বিদ্যুতের ফ্যান ঘুরছে। প্রায় সময় ডেক সেটে গান বেজে ওঠছে। রাতে চলে মেমরি কার্ড দিয়ে ছোট আকারে ডিজিটাল টেলিভিশন। আর তাদের হাতে হাতে আছে মুঠোফোন।ছেলে ও মেয়েদেরকে সময় মত তারা নিজেরাই পড়াশুনা করিয়ে থাকেন। সকালে ও বিকেলে তাদের ছেলে-মেয়েদেরকে দাবা, ফুটবল, ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টনও খেলতে দেখা গেছে। বড়রা জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রতি সচেতন বলে জানিয়েছে। স্বাস্থ্য সম্মত অস্থায়ীভাবে টয়লেট ব্যবহার করে না এমন তাদের একটি পরিবারও খুঁজে পাওয়া যায়নি। বর্তমান তাদের জীবন ধারায় অনেক পরিবর্তন এসেছে, এসেছে এখন আধুনিকতার ছোঁয়া।
 
আলাপকালে জানা যায়, বেদে সম্প্রদায়ের মানুষেরা জীবন ধারণের জন্য পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। তারা একত্রে খোলা আকাশের নিচে বিভিন্ন গাছের নিচে, অস্থায়ী ঝোপ-ঝাড়ে এবং বিভিন্ন পুকুর পাড়ে বসবাস করেন। গোখরো, শঙ্খিনী, দারাজ, পক্ষিণী, বাঁশপাতাসহ বিভিন্ন জাতের সাপ, বেজি ও বানর তাদের নিত্য সঙ্গী। তারা বন-জঙ্গলে সাপ ধরে। আর সাপ, বেজি ও বানর দিয়ে খেলা দেখানোর কৌশল তাদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন। তবে, বেদে মেয়েরা ছোট ছোট বাক্সে করে নানা জাতের সাপ নিয়ে বিভিন্ন বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঘুরে বাত ব্যথা ও দাঁতের পোকা রোগের চিকিৎসা দেন আর ছেলেরা বিভিন্ন স্থানে গিয়ে বেজি ও বানর দিয়ে খেলা দেখান। তাছাড়া তারা বিভিন্ন গাছ-গাছরা দিয়ে ঔষধ তৈরি করে এবং তা বিভিন্ন হাটে-বাজারে বিক্রি করে তাদের পরিবারে সদস্যদের খাবার জোগাড় করেন।
 
IMG0
 
কালাই পৌরসভার ধাপ মহল্লার সারপুকুর পাড়ে অস্থায়ীভাবে বসবাস করা বেদে সম্প্রদায়ের সরদার আসাদুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, 'আমরা আগে বিভিন্ন নদ-নদীর পানিতে ভেসে ভেসে বেড়াতাম। যাযাবরের মতো আমরা জীবন যাপন করতাম এবং অনেক সময় খেয়ে না খেয়ে থাকতাম। এখন আমরা প্রায় সবাই ডাঙায় উঠে এসেছি। আমরা আগের চেয়ে শত গুণে ভাল ও সুখে আছি। বিভিন্ন জায়গায় ভাল কামায় রোজগার করছি এবং পরিবারে সকল সদস্যদেরকে নিয়ে ভাল-মন্দ খাচ্ছি। আমরা নিজেরাই আমাদের সন্তানদেরকে পড়াশুনা দিয়ে শিক্ষিত করছি। অবসর সময়ে আমরা কখনো টিভি দেখি বা ঘরে বসে ডেক সেটে গান শুনি, আবার কখনো দূরে আপনজনদের সঙ্গে মোবাইলে সুখ দুঃখের কথা বলি।'
 
ইত্তেফাক/জামান