গাইবান্ধার রাজাকার কমান্ডার ও সাবেক সংসদ সদস্য জামায়াত নেতা আবু সালেহ মুহাম্মদ আব্দুল আজিজ মিয়া ওরফে ঘোড়ামারা আজিজসহ ছয় আসামির ফাঁসির রায়ে সুন্দরগঞ্জসহ গোটা জেলায় বইছে আনন্দের বন্যা।
তার ফাঁসির রায়ে উপজেলা সদরে আওয়ামী লীগ, জাসদ, জাপা, সিপিবি, বাসদসহ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সকল রাজনৈতিক সংগঠন বুধবার দুপুরে বের করে আনন্দ মিছিল। মিছিলটি সুন্দরগঞ্জ শহরের বঙ্গবন্ধু চত্বর থেকে বের হয়ে বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে বিভিন্ন সংগঠন ও ব্যক্তির পক্ষ থেকে সুন্দরগঞ্জে মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
জেলা আওয়ামী যুবলীগও দুপুরে গাইবান্ধা শহরে একটি আনন্দ মিছিল করে। এসব মিছিলে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সকল রাজনৈতিক সংগঠন ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধা এবং স্বাধীনতার পক্ষের মানুষরা অংশ নেয়।
এদিকে মামলার সাক্ষীদের নিরাপত্তায় প্রশাসনের কঠোর নজড়দারী দেখা গেছে। তাদের বাড়ি-ঘর ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের টহলও জোরদার করা হয়েছে।
রায় ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মামলার সাক্ষী উপজেলার ধর্মপুর ও মজুমদার গ্রামের আব্দুর রশিদ, রফিকুল ইসলাম, রাজা মিয়া এবং সুন্দরগঞ্জের সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার এমদাদুল হক বাবলু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা সাজেদুল হক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগেই স্বাধীনতা বিরোধীদের বিচার সম্ভব হয়েছে। এই রায়ে আমরা খুশি এবং আনন্দিত।
এছাড়া পলাতক আসামিদের গ্রেফতার করে এই ফাঁসির আদেশ যাতে অবিলম্বে কার্যকর করা হয় তারও দাবি জানান তারা। পাশাপাশি এই মামলার সাক্ষী ও নিহতের পরিবারদের জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী চক্রের হামলার হাত থেকে নিরাপত্তা বিধানেরও দাবি জানান।
জেলা যুবলীগের সভাপতি সরদার মো. শাহীদ হাসান লোটন ও সাধারণ সম্পাদক শাহ আহসান হাবীব রাজীব জানান, ঘোড়ামারা আজিজের মৃত্যুদণ্ডের রায়ে এ অঞ্চলের জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।
জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ফরহাদ আব্দুল্লাহ হারুন বাবলু বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করে রায় কার্যকরের জোর দাবি জানাচ্ছি।
জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ শামস্-উল আলম হিরু জানান, তারা প্রত্যাশিত রায় পেয়েছেন। এখন দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় কার্যকর হবে বলে আশা করছেন।
বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাইবান্ধা জেলা ইউনিট কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার গৌতম চন্দ্র মোদক বলেন, ঘোড়ামারা আজিজসহ অন্যান্য আসামিরা ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিল। তাদের সকলের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে। এই রায়ে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা সন্তুষ্ট ও ভীষণ খুশি হয়েছি।
মামলার বাদী আনিছুর রহমান সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, আমিসহ আমার পরিবার এ রায়ে খুশি।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে আরও জানান, রায় ঘোষণার পর তার ও তার পরিবারসহ সাক্ষীদের উপর স্বাধীনতা বিরোধী চক্র যেকোন সময় হামলা চালিয়ে জীবননাশের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে। তাই এ রায় যতদিন কার্যকর হয়নি ততদিন পর্যন্ত বাদী ও সাক্ষী পরিবারের লোকজনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করণের দাবিও জানান তিনি।
IMG0
গাইবান্ধার পুলিশ সুপার মো. মাশরুকুর রহমান খালেদ এই মামলার বাদী ও সাক্ষীদের ভয়ের কোন কারণ নেই উল্লেখ করে বলেন, এব্যাপারে সুন্দরগঞ্জ থানা পুলিশকে তাদের প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া এই মামলার রায়কে কেন্দ্র করে কোন দুষ্ট চক্র যাতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যাপারে জননিরাপত্তা বিধানে প্রয়োজনীয় সব রকম পদক্ষেপও গ্রহণ করা হয়েছে।
যেভাবে আব্দুল আজিজ থেকে ঘোড়ামারা আজিজে পরিণত হন: জানতে চাইলে উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লায়েক আলী খান মিন্টু তার ফাঁসির রায়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে জানান, আবদুল আজিজ মুক্তিযুদ্ধের সময় গাইবান্ধা মহকুমার রাজাকার কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন আজিজ তার রাজাকার বাহিনী নিয়ে সুন্দরগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত পাহাড়া দিতেন। একদিন তার গ্রামের বাড়ির কাছে সুন্দরগঞ্জের মাঠেরহাট সড়কে এক ব্রিজ পাহাড়া দিচ্ছিলেন। এ সময় ব্রিজের কাছে আখক্ষেত নড়েচড়ে উঠলে মুক্তিযোদ্ধা ভেবে এলোপাথারী গুলি করেন। কিছুক্ষণ পরে তারা ওখানে গিয়ে দেখেন একটি ঘোড়া গুলিবিদ্ধ হয়ে মরে পড়ে আছে। এরপর থেকেই এলাকায় সবাই তাকে ঘোড়ামারা আজিজ বলে ডাকতে শুরু করে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
