বরিশালের কীর্তনখোলা পাড় দখল করে গড়ে উঠছে কলকারখানা। আর এর বর্জ্যে কীর্তনখোলার পানি দূষিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নগরীর রূপাতলীতে কীর্তনখোলা নদীতীর ঘেঁষে ওষুধ কারখানা, কিন্তু বর্জ্য পরিশোধনাগার নেই। সেখানকার বর্জ্য ড্রেনের মাধ্যমে কীর্তনখোলা নদীতে যাচ্ছে। নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডের কলেজ রোডে অবস্থিত ইলেকট্রনিক্স মালামাল প্রস্তুতকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য নিজস্ব ড্রেন দিয়ে সিটি করপোরেশনের ড্রেনের মাধ্যমে চলে যায় কীর্তনখোলা নদীতে। ফলে প্রতিদিন দূষিত হচ্ছে নদীর পানি। এছাড়া, নদীতীরে গড়ে ওঠা সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, জাহাজ নির্মাণ প্রতিষ্ঠান, তেল ডিপো, মত্স্য ও কাঁচাবাজারের বর্জ্য কীর্তনখোলার পানি দূষিত করে তুলছে। ঢাকা-বরিশাল রুটসহ অভ্যন্তরীণ রুটের লঞ্চগুলো বরিশাল নৌ-বন্দরে নোঙ্গর করে ধোয়া-মোছা থেকে শুরু করে লঞ্চের যাবতীয় ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে কীর্তনখোলার পানিতে। ফলে পানির সবচেয়ে খারাপ অবস্থা নৌবন্দর এলাকার।
বিআইডব্লিউটিএর বরিশাল বন্দর ও পরিবহন বিভাগের যুগ্ম পরিচালক আজমল হুদা মিঠু সরকার বলেন, ‘সর্বশেষ গতমাসে বরিশাল জেলা প্রশাসক জেলার বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে যৌথ জরিপ করে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহ্বায়ক করে কমিটি গঠন করেন। কমিটিতে বরিশাল নদী বন্দরের উপ-পরিচালক, বিআইডব্লিউটিএর বরিশালের নির্বাহী প্রকৌশলী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিনিধি, সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধি, পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিনিধির সমন্বয়ে যৌথ জরিপ করে সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। সীমানা নির্ধারণ কার্যক্রম সম্পন্ন হলে সীমানা পিলার স্থাপন-পূর্বক অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদসহ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক (উপ-সচিব) মো. আব্দুল হালিম বলেন, ‘নদী তীরের মালিকানা যে দপ্তরের, অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদে তাদেরই এগিয়ে আসতে হবে। দখলদারদের উচ্ছেদ করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের পক্ষ সকল প্রকার সহযোগিতা করা হবে। তবে নদীর পানি দূষণের ব্যাপারে বরিশাল পরিবেশ অধিদপ্তর যথেষ্ট সতর্ক। নিয়মিত কীর্তনখোলার বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে পানি সংগ্রহ করে তা পরীক্ষা করা হয় তবে নদীর পানির দূষণের মাত্রা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান নদীর পানি দূষিত করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
বরিশাল নদী-খাল বাঁচাও আন্দোলন কমিটির সদস্য সচিব কাজী এনায়েত হোসেন শিপলু বলেন, ‘কীর্তনখোলার তীর ঘেঁষে গড়েওঠা অনেক স্থাপনা অবৈধ। অবৈধ দখলদারদের কারণেও নদী দূষিত হচ্ছে। অচিরেই নদীর ওপার বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়সহ আশপাশের এলাকা বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওতায় আসার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে করে নদী দখল ও দূষণ বেড়ে যাবে। কীর্তনখোলা রক্ষায় অবৈধ দখল ও দূষণ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত।’
কীর্তনখোলার তীর দখল প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক এস এম অজিয়র রহমান বলেন, ‘উচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। এজন্য জেলার বিভিন্ন নদী ও খাল পুনরুদ্ধারের নিমিত্তে যৌথ জরিপের জন্য কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঐ কমিটির রিপোর্ট পেলেই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হবে।’
কমিটির আহবায়ক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি চেয়ে চিঠি প্রেরণ করা হয়েছে। শিগগিরই প্রতিনিধিদের নিয়ে কার্যক্রম শুরু করা হবে।’
এদিকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ সম্প্রতি কীর্তনখোলা নদীর বিভিন্ন স্থান পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে বর্জ্য যে সকল স্থান থেকে নামছে তা নিয়ে করণীয় বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
মেয়র সাদিক আব্দুল্লাহ ইত্তেফাককে জানান, ইতোমধ্যে নদী দখল ও দূষণ রোধে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে তিনি কথা বলেছেন। তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে নদীকে বাঁচাতে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসককে আহবান জানিয়েছেন এবং সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতারও আশ্বাস দিয়েছেন।
