মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ে শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন নুসরাত জাহান রাফি। অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেননি তিনি। অন্যায়ের প্রতিবাদ করেই আগুন সন্ত্রাসের শিকার হয়েছিলেন। টানা পাঁচ দিন অসহনীয় যন্ত্রণা সয়ে মৃত্যুর কাছে হার মানলেন তিনি। তার জন্য দোয়া করেছেন দেশের প্রতিটি মানুষ। চিকিত্সকদের প্রাণান্তকর চেষ্টা, কোনো কিছুই বাঁচাতে পারল না মেয়েটিকে। গতকাল বুধবার রাত সাড়ে ৯টায় সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে যান নুসরাত। তাকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নুসরাতকে পাঠানোর চেষ্টা হয়েছিল সিঙ্গাপুরেও; কিন্তু শারীরিক অবস্থার কারণে পাঠানো যায়নি। প্রতিদিন ফোন করে মেয়েটির খোঁজ নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। যা কিছু করা সম্ভব, সবকিছুই করতে বলেছেন, তবুও বাঁচানো যায়নি।
নুসরাতকে বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিত্সায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম। তিনি বলেন, ‘বুধবার সকাল থেকে তার অবস্থার অবনতি হতে থাকে। একাধিকবার তার হার্ট অ্যাটাক করেছিল, তারপরও সে সার্ভাইভ করছিল; কিন্তু রাত সাড়ে ৯টার দিকে সে মারা যায়।’
নুসরাতের চাচাতো ভাই ওমর ফারুক বলেন, ‘দুপুরে রক্তের দরকার পড়েছিল, তখন আমরা রক্ত সংগ্রহ করে দিয়েছিলাম; কিন্তু চিকিত্সকরা সকাল থেকে বারবার আমাদের নুসরাতের অবস্থার অবনতির কথা বলছিলেন। চিকিত্সকদের আশঙ্কাই সত্যি হলো।’ মৃত্যুর খবর শুনে বার্ন ইউনিটের আইসিইউর সামনে নুসরাতের বাবা, বড়ো ভাই ও মামা কান্নায় ভেঙে পড়েন। নুসরাতের বাবা এ কে এম মুসা বলেন, ‘আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ, আমরা শুধু অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’ নুসরাতের চাচাতো ভাই ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘আমরা নুসরাত হত্যার বিচার চাই, আর কিছু বলার নাই। যারা এমন একটা কাজ করলো, তারা এখনো ঘুরে বেড়াচ্ছে, আমরা তাদের সবার শাস্তি চাই।’
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্লাস্টিক সার্জারি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানভীর আহমেদ বলেন, ‘নুসরাতকে যে বাঁচানো গেল না, কারণ হলো শতকরা ৮৫ ভাগ মেজর বার্ন। এরমধ্যে ৬০ ভাগ গভীর পোড়া। তার শ্বাসতন্ত্র পোড়া আছে। কেরোসিন নিজেই টক্সিক। এটা ফুসফুস এবং ব্রেনের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয়। এই চারটিই তার মৃত্যুর প্রধান কারণ বলা যায়। চিকিত্সকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তাকে বাঁচাতে।
নুসরাতের মরদেহ গতকাল বুধবার রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে রাখা হয়। আজ বৃহস্পতিবার সকালে তার ময়নাতদন্ত করা হবে। এরপর তার মরদেহ ফেনীতে নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানিয়েছেন
ঢামেক বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বলেন, ‘নুসরাতকে বাঁচানোর জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ডিপ বার্ন হওয়ায় প্রথম থেকেই বাঁচার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। আজকেও সিঙ্গাপুরের চিকিত্সকদের সঙ্গে কথা হয়েছিল। রাতেও কথা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে নুসরাতের লাশের পোস্টমর্টেম করা হবে। বুধবার রাতে লাশ হিমঘরে রাখা হয়েছে। পোস্টমর্টেম শেষে তাকে ফেনী নিয়ে যাওয়া হবে।’
গত শনিবার সকালে আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা দিতে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে বোরকা পরা চারজন তাকে মামলা তুলে নিতে বলে। তাতে রাজি না হওয়ায় ওড়না দিয়ে তার হাত বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। জবানবন্দিতে নুসরাত বলেন, বোরকায় মুখ ঢাকা থাকায় ওই চারজনের কাউকে তিনি চিনতে পারেননি। তবে একপর্যায়ে তাদের একজন আরেকজনকে শম্পা নামে ডেকেছে।
নুসরাতের চাচা নুরুল হুদা শামীম জানান, এখন পর্যন্ত পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বৃহস্পতিবার বাদ আসর সোনাগাজী সাবের পাইলট হাইস্কুল মাঠে জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে। ঢাকা মেডিক্যালে উপস্থিত স্বজনদের অনেকেই বলেছেন, ‘নুসরাতের হত্যাকাণ্ডের বিচার বিশেষ ট্রাইব্যুনালে হওয়া দরকার। দ্রুত অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করলে অন্যরা অপরাধ করতে সাহস করবে না।
নুসরাত জাহান রাফির মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাত সাড়ে ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব ইমরুল কায়েস এ তথ্য জানিয়েছেন। সোমবার দগ্ধ ছাত্রীকে উন্নত চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুরে পাঠানোর নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। মেয়েটির শারীরিক অবস্থার কারণে পাঠানো যায়নি। নুসরাতের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম।
