মহাস্থানগড়ে তেইশ শ’ বছরের স্থাপত্য শৈলী

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৯:৩৭
 
বগুড়ার মহাস্থানগড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে বেরিয়ে এসেছে তেইশ শ’ বছরের প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন। খ্রিস্টপূর্ব সময়ের সমৃদ্ধ প্রত্ন সামগ্রীও পাওয়া গেছে এবারের খননে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এ তথ্য জানান। 
 
এরমধ্যে গুপ্তযুগের শেষাংশ থেকে পাল আমলের শুরুর দিকে স্থানীয় গৃহস্থালীর পানি সরবরাহের কূপের সন্ধান পাওয়া গেছে। সেখান থেকে প্রাপ্ত প্রত্ন সামগ্রী নিশ্চিত করেছে মহাস্থানগড় সেই সুড়ঙ্গ  যুগেও ঐতিহ্য, সংস্কৃতিতে ছিল সমৃদ্ধ। 
 
প্রায় আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন নগরী ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান মহাস্থানগড়ে বাংলাদেশ-ফান্স যৌথ খননকালে এসব নিদর্শনের সন্ধান মেলে। গত ২৮ অক্টোবর থেকে ১৮তম খনন কাজ শুরু হয় মহাস্থানগড়ে। ফ্রান্সের প্রতিনিধি দলটি ২৯ নভেম্বর তাদের খনন কাজ শেষ করলেও স্থানীয়ভাবে যে খনন কাজ তা অব্যাহত রয়েছে। 
 
আর এবার এই খননে যেসব স্থাপত্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে তা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে মুসলিমপূর্ব যুগের নির্দেশ করছে এমনটাই দাবি করেছেন প্রত্নতাত্ত্বিকরা। 
 
মহাস্থানগড় ঐতিহাসিকস্থান হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে খনন করা হয়েছে। খননের বিভিন্ন পর্যায়ে এখানে বেরিয়ে এসেছে গুরুত্বপূর্ণ সব প্রত্ন নিদর্শন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৩ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স সরকার যৌথভাবে খনন কাজ পরিচালনা করে আসছে। এরআগে বিভিন্ন সময়ে ১৭ দফায় এখানে খনন কাজ চালানো হয়েছে। এবার শুরু হয় ১৮তম খনন কাজ। 
 
এবারের খননে সেখানে একটি প্রাচীন কূপের সন্ধান মিলেছে। প্রায় ৯ ফুট গভীর কূপটির চারপাশ ইটের বেদী ঘেরা। খননকাজে নিযুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা গুপ্তযুগের শেষাংশ থেকে পাল আমলের শুরুর দিকে স্থানীয় গৃহস্থালীর পানি সরবরাহের উদ্দেশ্যে তা খনন করা হয়। এর পাশেই উন্মোচিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দের স্থাপত্য শৈলী।
 
এবারের খননকাজে নেতৃত্বে ছিলেন ফ্রান্সের পক্ষে আট সদস্যের প্রতিনিধি দল। এদের মধ্যে দলনেতা ছিলেন খনন বিশেষজ্ঞ কোলিন লেফনারেক। এছাড়া বাংলাদেশের পক্ষে খননকাজে নিযুক্ত ৬ সদস্যের দলের ফিল্ড ডাইরেক্টর হিসেবে ছিলেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা। এছাড়াও দলনেতা হিসেবে ছিলেন মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টডিয়ান মজিবর রহমান। দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন সহকারী কাস্টোডিয়ান এসএম হাসনাত বিন ইসলাম, সিনিয়র ড্রাফটম্যান আফজাল হোসেন, ফটোগ্রাফার আবুল কালাম আজাদ ও লোকমান হোসেন।
 
মহাস্থান জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান এসএম হানাত বিন ইসলাম জানান, এবার খননকালে সেখানে স্থাপত্য শৈলীর পাশাপাশি বেশকিছু প্রত্নবস্তুর সন্ধান মিলেছে। তার মধ্যে রয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ২০০ অব্দের ছাপাঙ্কিত ব্রঞ্জের মুদ্রা, সুড়ঙ্গযুগীয় টালির (টাইলস) ভগ্নাংশ, উত্তরাঞ্চলীয় উজ্জ্বল চকচকে কালো মৃৎপাত্র, বিভিন্ন যুগের মৃৎপাত্রের ভগ্নাংশ, পোড়া মাটির বাটি, পোড়া মাটির গুটিকা, পোড়া মাটির ছিদ্রযুক্ত গুটিকা, পাথরের গুটিকা ও কাঁচের গুটিকা। 
 
মহাস্থান জাদুঘরের কাস্টোডিয়ান মজিবর রহমান জানান, দীর্ঘদিন বিরতির পর আবার লইয়েরকুড়ি নামের এই ভিটায় খনন করা হয়েছে। পাকিস্তান আমলে এখানে প্রথম খনন করা হয়েছিল। সেই সময় দুটি প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান মিলে। এবারের খননে ফ্রান্সের দল তাদের কাজ শেষ করলেও স্থানীয়ভাবে খননকাজ অব্যাহত রয়েছে।
 
প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা জানান, মহাস্থানগড়ের প্রাচীনত্ব বিশ্ব স্বীকৃত। সেই স্বীকৃতির নিদর্শনই প্রতি বছরের খননকাজে উন্মোচিত হচ্ছে। এবার সেখানে যে টাইলসের নমুনা মিলেছে তা প্রমাণ করে খ্রিস্টের জন্মের আগে এই জনপদ কতটা সমৃদ্ধ ছিল। সেই সময়েও মানুষ তাদের ব্যবহারের জন্য টাইলসের ব্যবহার করেছে। এবার খননে যেসব স্থাপত্য নিদর্শনের সন্ধান পাওয়া গেছে তা খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দ থেকে শুরু হয়ে মুসলিমপূর্ব যুগের নির্দেশ করছে।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি