বে-দখল হয়ে যাচ্ছে গণকবরগুলো

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৭, ০২:০৬

একাত্তরের ৩ ডিসেম্বর। মহান মুক্তিযুদ্ধে আজকের এই দিনে ঠাকুরগাঁও পাক হানাদার মুক্ত হয়েছিল। অত্র অঞ্চলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মরণপণ লড়াই আর মুক্তিকামী জনগণের দুর্বার প্রতিরোধে নভেম্বরের শেষ দিক থেকে পিছু হটতে শুরু করে পাকিস্তানি সৈন্যরা। তাদের চূড়ান্ত পরাজয় ঘটে আজকের এই দিনে।
IMG0
ঠাকুরগাঁও তখন ছিল মহকুমা। বর্তমান ঠাকুরগাঁও এবং পঞ্চগড় জেলার ১০টি থানা ছিল এই মহকুমার অন্তর্গত। ৩ ডিসেম্বর সকাল থেকেই ঠাকুরগাঁও শহরে মানুষ জড়ো হতে থাকে। শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বের হয় আনন্দ মিছিল। জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে এ অঞ্চলের জনপদ।
IMG1
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতের পর সারা দেশের মতো ঠাকুরগাঁয়েও পাকিস্তানি সৈন্যরা আক্রমণ করে। ১৫ এপ্রিল আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পাকবাহিনীর দখলে চলে যায় ঠাকুরগাঁও।
IMG2
এরই মধ্যে সংগঠিত হতে থাকে ঠাকুরগাঁওয়ের মুক্তিকামী মানুষ। তারা হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে গড়ে তুলে দুর্বার প্রতিরোধ। ঠাকুরগাঁও তখন ছিল ৬ নম্বর সেক্টরের অন্তর্ভুক্ত। কমান্ডার ছিলেন বিমান বাহিনীর স্কোয়াড্রন লিডার এম. খাদেমুল বাশার। এ সেক্টরে প্রায় ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিল। ২৯ নভেম্বর এই মহকুমার পঞ্চগড় থানা প্রথম শত্রুমুক্ত হয়। পঞ্চগড় হাতছাড়া হওয়ার পর পাকবাহিনীর মনোবল ভেঙে যায়। এরপর তারা শক্তি বৃদ্ধি করে সদলবলে প্রবেশ করে ঠাকুরগাঁয়ে।
IMG3
২ ডিসেম্বর রাতে ঠাকুরগাঁয়ে প্রচণ্ড গোলাগুলি শুরু হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনপণ লড়াইয়ে সে রাতেই শত্রুবাহিনী ঠাকুরগাঁও থেকে পিছু হটে ২৫ মাইল নামক স্থানে অবস্থান নেয়। ৩ ডিসেম্বর ভোর রাতে ঠাকুরগাঁও শহর শত্রুমুক্ত হয়।
IMG4
অপরদিকে মুক্তিযুদ্ধের ৪৬ বছর পরেও জেলা শহর থেকে পল্লী অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের স্মৃতি বিজড়িত গণকবর আর বধ্যভূমিগুলো বেহাল অবস্থায় রয়েছে। অযত্ন আর অবহেলার মধ্যে পড়ে থাকা গণকবরগুলো দেখার কেউ নেই। অধিকাংশ গণকবর আর বধ্যভূমি এখন গো-চারণ ভূমিতে পরিণত হয়েছে। কিছু গণকবর বিক্রয় হয়ে যাওয়ার মত ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু প্রশাসন নিরব ভুমিকা পালন করছে।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পর বিক্রি হয়ে গেছে ঠাকুরগাঁও রানীশংকৈল উপজেলার মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বর নির্যাতন আর হত্যাযজ্ঞের সাক্ষী বধ্যভূমি খুনিয়াদিঘি। এই বধ্যভূমি বিক্রির পেছনে স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন অনেকে।

১৯৭১ সালে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে যারা এতোটুকু কুণ্ঠিত হয়নি, আজ সেই সব শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিকামী সাধারণ মানুষ পায়নি তাদের যথাযথ মর্যাদা।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদদের স্মৃতির প্রতি যথাযথ সম্মান দেখিয়ে গণকবর ও বধ্যভূমিগুলো সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। দু’একটি জায়গায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও সেগুলো অযত্নের মধ্যে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে।

প্রতিবার এসব গণকবর নিয়ে সংবাদ প্রকাশ হওয়ার পরেও কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় নাই। এতে সংবাদকর্মী ও সরকারের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে শহীদদের পরিবার ও সাধারণ মানুষ।

ইত্তেফাক/নূহু