রংপুর সিটি কর্পোরেশন (রসিক) নির্বাচনের মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের সোমবার প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রতীক বরাদ্দের পর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু করেছেন।
প্রতীক পাওয়ার পর প্রার্থীরা তাদের সমর্থকদের নিয়ে আনন্দ মিছিল এবং গণসংযোগ শুরু করেন। এ সময় তারা মিষ্টি বিতরণও করেন। মেয়র পদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু নৌকা প্রতীক, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী রংপুর মহানগর বিএনপি’র সহ-সভাপতি কাওসার জামান বাবলা ধানের শীষ প্রতীক, জাতীয় পার্টি (এ) মনোনীত প্রার্থী রংপুর মহানগর সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা লাঙ্গল প্রতীক, বাসদের রংপুর জেলা আহ্বায়ক আব্দুল কুদ্দুস মই প্রতীক, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের রংপুর জেলা সভাপতি এটিএম গোলাম মোস্তফা বাবু হাতপাখা প্রতীক, ন্যাশনাল পিপলস পার্টির সেলিম আখতার আম প্রতীক, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের ভাতিজা ও পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ হাতি প্রতীক পেয়েছেন বলে রিটার্নিং ও রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার জানিয়েছেন।
তিনি আরো জানান, সিটি কর্পোরেশনের ৩৩টি ওয়ার্ডের সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৫টি জন প্রার্থীর প্রতীকও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যে সকল প্রতীক একাধিক প্রার্থী দাবি করেছেন-লটারির মাধ্যমে সে সকল প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচনকে সামনে রেখে সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার থেকে ১১জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রংপুর সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনী মাঠের কাজে মনিটরিং করবেন। তারা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করবেন। যদিও আরো আগে থেকেই মনিটরিং করছেন প্রার্থীদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা।
তিনি আরো বলেন, কোনো প্রার্থী যাতে নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করতে না পারেন, সেদিকেই নজর দেবেন তারা। তাছাড়া নির্বাচন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন সজাগ দৃষ্টি রেখে যাবে, যাতে করে কোনো প্রার্থীই নির্বাচনী পরিবেশ ভণ্ডুল করতে না পারেন। তাদের দায়িত্ব থাকবে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচনের প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া এবং আমাদেরও দায়িত্ব থাকবে কোনো প্রার্থী যেন প্রচারকাজে বাধার সম্মুখীন না হন। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে যা যা প্রয়োজন সব ব্যবস্থাই গ্রহণ করা হচ্ছে বলে জানান তিনি। নির্বাচনে কয়েকটি সেন্টারে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এর আগে রসিক নির্বাচনে মেয়র পদে ১৩জন ও ৩৩টি ওয়ার্ডে সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২২৬জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৭টি জন মনোনয়ন জমা দেন। এর মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন রবিবার সাধারণ কাউন্সিলর পদে ১০জন মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও মেয়র ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদের কোনো প্রার্থী তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। মনোনয়ন বাতিল, আপিল নিষ্পত্তি ও প্রত্যাহার শেষে সর্বশেষ মেয়র পদে ৭জন এবং সাধারণ কাউন্সিলর পদে ২১১জন এবং সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে ৬৫টি জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।
এদিকে, জাতীয় পার্টির (এ) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদের নির্দেশ উপেক্ষা করে শেষ পর্যন্ত নিজ সিদ্ধান্তেই অনড় থাকলেন এরশাদের ভাতিজা ও পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও সাবেক এমপি হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ। রসিক নির্বাচনে মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষদিন রবিবার আসিফ তার মনোনয়ন প্রত্যাহার করেননি। এরআগে দলীয় সিদ্বান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর কারণে ও মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য আসিফকে নির্দেশ দিয়েছিলেন এরশাদ। নির্দেশ অমান্য করলে জাতীয় পার্টির (এ) সকল পদ ও পদবী থেকে অব্যাহতি দিয়ে প্রাথমিক সদস্য পদ বাতিল করে বহিষ্কারের ঘোষণা দিলেও তাতে কর্ণপাত না করে নিজের সিদ্ধান্তে অনড় থাকলেন আসিফ। ইতিমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে শতাধিক কেন্দ্র ভোট কমিটি গঠন করে ফেলেছেন তিনি।
অপরদিকে, নির্দেশ অমান্য করে নির্বাচন করলেও শেষ পর্যন্ত এরশাদ তার ঘোষণা কার্যকর করেননি। উল্টো তিনি মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে রবিবার এরশাদ পার্টি নেতাকর্মী নিয়ে শারীরিক চেকআপের জন্য সিঙ্গাপুর গেছেন। মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের শেষ দিনে আসিফকে বহিষ্কার কিংবা তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক গ্রহণ করায় রংপুরে জাতীয় পার্টির (এ) অভ্যন্তরে নেতাকর্মীদের মাঝে নানা ধরণের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে হোসেন মকবুল শাহরিয়ার আসিফ সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি স্বতন্ত্র পদে ভোট করছি। দলীয় পদে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তার গ্রহণযোগ্যতা নেই। আমি এরআগে সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। নেতাকর্মীরা আমাকে মেয়র পদে দেখতে চায়। তাই তাদের দাবি উপেক্ষা করতে পারি নি। দল থেকে বহিষ্কার করা হলেও আমি তা মাথা পেতে নেব।
জাতীয় পার্টির মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থী রংপুর মহানগর সভাপতি মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা বলেন, তিনি বিপুল জনসমর্থন পাচ্ছেন। ভোটাররা মনে করছেন এবার সত্যিকার অর্থে ঠিক মানুষকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এর আগে চাপিয়ে দেওয়া লোকদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাই লাঙ্গল প্রতীকের পক্ষে এবার বিপুল জোয়ার এসেছে।
জাপা বিদ্রোহী প্রার্থী আসিফের ব্যাপারে তিনি বলেন, আসিফের বয়স কম, রাজনীতি বোঝে না। তার সঙ্গে কেউ নেই, জাপার সকল নেতাকর্মী আমার পক্ষে রয়েছে। লাঙ্গলের জোয়ার উঠেছে। যেখানেই যাচ্ছি সেখাই সবাই লাঙ্গলে ভোট দিবেন বলে আশ্বস্ত করছেন। আমি বিপুল ভোটে বিজয়ী হবো।
এদিকে, এরশাদের ভাতিজা নির্বাচনে থাকায় মোস্তফা সমর্থক ও আসিফ সমর্থকদের মাঝে যে কোনো সময় অপ্রীতিকর ঘটনার আশংকা করা হচ্ছে। অপরদিকে, আওয়ামী লীগ মনোনিত প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু বলেছেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা গণতন্ত্রের মানস কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা এর আগে আমাকে রসিকের মেয়র পদে কাজ করার সুযোগ দেওয়ায় আমি নির্বাচিত হয়েছিলাম। গত ১৬ বছরে রংপুর অঞ্চলের সংসদ নির্বাচনে অধিকাংশ নৌকা প্রতীক হাত ছাড়া হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী আমাকে বিশ্বাস করে নৌকা প্রতীক দিয়েছেন। আমি আল্লাহর দোয়ায় ও শেখ হাসিনার আশীর্বাদে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিজয়ী হতে পারলে এ অঞ্চলের নৌকার জাগরণ তৈরি করব। হারানো আসনগুলো নৌকা মার্কায় বিজয়ী করে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করব। রংপুরের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌকা প্রতীক আমাকে দিয়েছেন।
জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মমতাজ উদ্দিন, সাধারণ সম্পাদক রেজাউল করিম রাজু ও মহানগর কমিটির সভাপতি সাফিউর রহমান সফি এবং সাধারণ সম্পাদক তুষার কান্তি মণ্ডল জানান, আমরা সকল ভেদাভেদ ভুলে নৌকার বিজয়ের লক্ষ্যে দিন-রাত পরিশ্রম করছি। প্রধানমন্ত্রী রংপুরের উন্নয়নের দায়িত্ব নেওয়ার পর যে উন্নয়ন হয়েছে স্বাধীনতার পরবর্তীতে কোনো সরকার রংপুরের এতো উন্নয়ন করেনি। সে কারণে রংপুর সিটি কর্পোরেশনের ভোটাররা নৌকা প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো প্রতীকের নাম শুনতে চাচ্ছে না। আমরা যেখানেই যাচ্ছি সেখানেই নৌকার গণজোয়ার লক্ষ্য করছি।
মহানগর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক তৌহিদুর রহমান টুটুল বলেন, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টুর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে সোমবার রাতে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেনের নের্তৃতে ২১ সদস্যের একটি টিম রংপুরে আসছেন। তারা ভোট শেষ হওয়া পর্যন্ত রংপুরে অবস্থান করবেন। এছাড়া দলের আরো শীর্ষ নেতারা সিটি কর্পোরেশনের ভোট উপলক্ষে রংপুরে আসবেন।
বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মহানগর সহ-সভাপতি কাওসার জামান বাবলা জানান, অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট হলে তার বিজয় কেউ ঠেকাতে পারবে না। তার মনোনয়ন বাতিলের জন্য সরকার নানা ষড়যন্ত্র করেছিল। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র হয়নি।
তিনি জানান, ইতিমধ্যে আমি দলীয় চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। তিনি দলীয় মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল রিজভীকে নির্দেশ দিয়েছেন। তারা রংপুরে এসে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবেন। এছাড়া দলের আরও শীর্ষ নেতারা রংপুর আসবেন এবং নির্বাচনের শেষ পর্যন্ত থাকবেন। রংপুরের নির্বাচনে কোনো ষড়যন্ত্র করা হলে তার প্রভাব জাতীয় রাজনীতিতে পড়বে। এ কারণ বিএনপি’র হাইকমান্ড রংপুরের নির্বাচনের উপর গভীর দৃষ্টি রাখছে।
এদিকে, বিএনপি মনোনীত ধানের র্শীষ প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনার জন্য রংপুর মহানগর বিএনপি’র সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কমিটির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক মুক্তিযোদ্ধা মোজাফফর হোসেনকে আহ্বায়ক করে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট একটি নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অপরদিকে, বিকেলে এ রিপোর্ট পাঠানোর সময় বিএনপি’র রংপুর বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক লালমনিরহাট জেলার কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু নির্বাচন পরিচালনা কমিটি ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে স্থানীয় একটি কমিউনিটি সেন্টারে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বৈঠক করছিলেন।
রিটার্নিং ও রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা সুভাষ চন্দ্র সরকার বলেন, নির্বাচনে কোনো ধরণের ভোট কারচুপি, জালিয়াতি বা ডাকাতি হবে না। অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন আমরা উপহার দেব। নির্বাচনে কোনো প্রার্থীর পক্ষ নেওয়ার সুযোগ নেই এবং এ জাতীয় কোনো চাপ আমাদেরকে দেওয়া হয়নি। এখন পর্যন্ত রংপুরে শান্তিপূর্ণ অবস্থান বিরাজ করছে। নির্বাচনে আমরা কোনো ধরণের বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতা কিংবা অপ্রতিকর ঘটনা ঘটতে দেব না সেজন্য আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে।
ইত্তেফাক/আরকেজি
