আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের পেছনে থাকা দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা পুলিশের একটি মটরসাইকেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। তারা বেশ কয়েকটি গাড়িও ভাঙচুর করে। সংঘর্ষে বঙ্গবাজার, হাইকোর্ট মোড় ও সচিবালয় এলাকা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। পুলিশ বিএনপির ১৫ জন নেতা-কর্মীকে আটক করেছে। এর মধ্যে বিএনপির ক্রীড়াবিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক গোলরক্ষক আমিনুল হক ও ঢাকার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রফিকুল ইসলামও রয়েছেন।
পুলিশের অভিযোগ, বিনা কারণে জড়ো হওয়া বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা গাড়ি ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। অন্যদিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, পুলিশ বিনা উস্কানিতে তাদের নেতা-কর্মীদের উপর হামলা চালিয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে বঙ্গবাজার এলাকায় বিএনপির নেতা-কর্মীরা মিছিল বের করেন। মিছিলটি শিক্ষা ভবনের দিকে পৌঁছালে পুলিশ মিছিলকারীদের বাধা দিয়ে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন একদল বঙ্গবাজারের দিকে ও অপরদল উল্টো ঘুরে জিরো পয়েন্টের দিকে পালিয়ে যায়। এ সময় সচিবালয়ের সামনের রাস্তা, বঙ্গবাজার ও হাইকোর্টের মোড় এলাকায় সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা সচিবালয়ের সামনে দিয়ে যাওয়ার পথে ‘ভাঙ গাড়ি’ বলে চিত্কার করতে করতে পার্কিং করা এবং চলতি পথের সরকারি বেসরকারি বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে। এসব গাড়ির সামনের, পেছনের ও পাশের কাঁচগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে।
খালেদা জিয়ার হাজিরাকে কেন্দ্র করে বিএনপির কয়েকশ নেতা-কর্মী নাজিমউদ্দিন সড়কের আদালত এলাকায় জড়ো হয়েছিল। গাড়ি ভাংচুরের প্রত্যক্ষদর্শী সিলেটের মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র ফজলুর রহমানের গাড়িচালক আব্দুস সালাম বলেন, অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে মেয়র দুপুর ১টায় সচিবালয়ে ঢুকেছিলেন। গাড়ি নিয়ে তিনি নিচে অপেক্ষা করছিলেন। বেলা ৩টার দিকে ৫ শতাধিক লোক মিছিল নিয়ে বৃষ্টির মতো ইট নিক্ষেপ করতে থাকে। বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের উপসচিব মো. রোকন উদ্দিনের গাড়িচালক মো. শাহজালাল বলেন, শিক্ষা ভবনের ওইদিক থেকে ৫০০ এর বেশি লোক এসে হট্টগোল করতে করতে গাড়ি ভাংচুর শুরু করে।
এদিকে বঙ্গবাজার এলাকায় ডিএমপি দক্ষিণ ট্রাফিক পুলিশের শাহবাগ জোনের ট্রাফিক সার্জেন্ট মো. মেহেদী হাসানের মোটরসাইকেলটি আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে বিক্ষোভকারীরা। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিপেটা ও বেশ কয়েকটি টেয়ার শেল নিক্ষেপ করে। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে ১৫ জনকে আটক করেছে।
পুড়িয়ে দেয়া মোটরসাইকেলের মালিক মেহেদী হাসান জানান, তিন সহকর্মীর সঙ্গে তিনি বঙ্গবাজার মোড়ে ডিউটি করছিলেন। হঠাত্ হাইকোর্ট মোড় থেকে একদল লোক ইট-পাটকেল ছুড়তে ছুঁড়তে তাদের দিকে ধেয়ে আসে। এ ঘটনায় তার সঙ্গে থাকা অন্য সার্জেন্টরা তাদের মোটর সাইকেল সরাতে পারলেও তিনি পারেননি। তিনি আরো বলেন, মোটরসাইকেলে ভেতরে মামলার গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিলো। সেগুলোর সব পুড়ে গেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের রমনা বিভাগের উপ কমিশনার মারুফ হোসেন সরদার ইত্তেফাককে বলেন, বেলা ৩টার দিকে হাইকোর্ট চত্বরের ভেতর থেকে ৫০/৬০ জন বিএনপি নেতাকর্মী জড়ো হয়ে হাইকোর্ট ক্রসিংয়ের দিকে এগিয়ে আসে। তখন আমরা তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। তখনও খালেদা জিয়া আদালত থেকে বাসায় ফেরেননি। রাস্তায় নির্বিঘ্নে যান চলাচলের স্বার্থে তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেওয়া হয়। এ সময় বিএনপি কর্মীরা বেশ কিছু গাড়ি ভাঙচুর করে। এ সময় ভাঙচুরকারীকে বেশ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে।
শাহবাগ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল হাসান ইত্তেফাককে বলেন, বিডিআর বিদ্রোহের মামলার বিচারক হাইকোর্টের বিচারপতি নজরুল ইসলামের প্রটেকশনের গাড়িও ভাংচুর হয়েছে। তিনি বলেন, ঘটনাস্থল থেকে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম, ঢাকার ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর রফিকুল ইসলামমহ ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক আমিনুল গোলরক্ষক ছিলেন।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন আদালত থেকে ফেরার সময় বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা রাস্তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। পুলিশ বিনা উস্কানিতে অতর্কিতে তাদের লক্ষ্য করে টিয়ার গ্যাস ছোঁড়ে, লাঠিচার্জ করে এবং ধরপাকড়-গ্রেফতার করে। এর মধ্যে দিয়ে সরকারের ‘স্বৈরাচারী মনোভাব’ আবারও প্রকাশ পেল মন্তব্য করেন রিজভী।
প্রসঙ্গত, খালেদা জিয়ার মামলাকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সরকার ফাঁদ পাতবে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে তাতে পা না দিতে দলের নেতা-কর্মীদের সমপ্রতি নির্দেশনা দিয়েছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। তার কয়েক দিনের মধ্যে এই ঘটনা ঘটল। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা বলে আসছেন, বিএনপিই পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চাইছে।
ইত্তেফাক/নূহু
