বেগম রোকেয়ার স্মৃতি কেন্দ্র অবহেলিত, পৈত্রিক জমি বেদখল

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০১৭, ২০:৪২
 
উপমহাদেশের নারী জাগরণের অগ্রদূত মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া ১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তার ১৩৭ তম জন্মদিন এবং একই সাথে ৮৫ তম প্রয়াণদিবস। রোকেয়ার আদর্শ, কর্ম ও জীবন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মকে অবহিত করার পাশাপাশি তার স্মৃতি এবং অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে রোকেয়ার জন্মভূমি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ গ্রামে নির্মিত হয় বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র। স্মৃতি কেন্দ্রটি একযুগেরও বেশি সময় ধরে অবহেলিত অবস্থায় পড়ে আছে। ফলে, যে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যে স্মৃতি কেন্দ্রটি চালু হয়েছে সেই লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
 
জানা যায়, ৯ ডিসেম্বর বেগম রোকেয়ার জন্ম ও প্রয়াণ দিবস উপলক্ষে ১৯৭৪ সাল থেকে পায়রাবন্দবাসী রোকেয়াকে স্মরণ করে রোকেয়া দিবস পালন করে আসছেন। সরকারিভাবে ১৯৯৪ সাল থেকে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে বেশ ঘটা করেই দিবসটি পালন করা হয়। সেই সঙ্গে পায়রাবন্দে ৯-১১ ডিসেম্বর রোকেয়া মেলা বসে। সেখানে তিনদিনব্যাপী আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়। এভাবে মেলাকেন্দ্রিক চক্রাকারে ঘুরছে রোকেয়া দিবস। কিন্তু এলাকাবাসীর দাবী এখানে এ ধরণের মেলা না করে যদি রোকেয়া দিবস উপলক্ষে তিনদিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করা যেতো তাহলে মেলায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বইপ্রেমীদের ভিড় বেশি হতো।
 
রোকেয়ার পৈত্রিক ভিটা বেদখল
পায়রাবন্দে বেগম রোকেয়ার পিতার ৩৫০ বিঘার উপরে সম্পত্তি ছিল। কিন্তু তার নামে এখন এক শতক জমিও নেই। বর্তমানে স্মৃতিকেন্দ্রটি ৩.১৫ বিঘা জমির উপর রয়েছে। রোকেয়ার পৈত্রিক জমি উদ্ধারে হাইকোর্টে একটি রিট মামলা চলমান রয়েছে। এলাকাবাসী দাবি করেন, রোকেয়ার পারিবারিক যে মসজিদটি রয়েছে সেটি পুরনো আদলে নির্মাণ, রোকেয়ার বাস্তুভিটার ধ্বংসাবশেষ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সংস্কার, একটি পর্যটন কেন্দ্র, রোকেয়া দিবস উপলক্ষে সাধারণ মেলার পরিবর্তে তিনদিনব্যাপী বইমেলার আয়োজন করার দীর্ঘদিনের দাবি থাকলেও এব্যাপারে সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। বিশেষ করে জেলা প্রশাসন এ ব্যাপারে একেবারেই উদ্যোগহীন বলে দাবি করেন এলাকাবাসী।
 
৫৩ বছরেও সরকারি হয়নি বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়
বেগম রোকেয়ার পৈত্রিক ভিটায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটি কলেজ সরকারি হলেও প্রতিষ্ঠার ৫৩ বছর পরেও বেগম রোকেয়া মেমোরিয়াল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টি সরকারি হয়নি। এটি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এলাকাবাসী বলেন, 'বেগম রোকেয়ার নামে পৈত্রিক ভিটায় অবস্থিত একটি বালিকা বিদ্যালয় সরকারি না হওয়া বেগম রোকেয়ার প্রতি আমাদের উদাসীনতারই বহি:প্রকাশ।'
 
স্মৃতিকেন্দ্রে কর্মরত কর্মচারীরা বেতন পান না ১৪ বছর
প্রায় তিন কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মিত স্মৃতিকেন্দ্রটির উদ্বোধন করা হয় ২০০১ সালের ১ জুলাই। কিন্তু একই বছরের ১৩ অক্টোবর তৎকালীন সরকার স্মৃতিকেন্দ্রের সব কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর ২০০৪ সালের জুলাই থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় উপপরিচালকসহ ১৩ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা। ইতোমধ্যে ওই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুইজন বেতন-ভাতা পেলেও অনেকেই অন্যত্র চলে গেছেন। বাকি পাঁচ কর্মচারী বেতন-ভাতা না পেলেও সেখানেই পড়ে আছেন।
 
এদিকে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পাওয়ায় পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন কর্মচারীরা। জানতে চাইলে বেতন বঞ্চিত কর্মচারী আব্দুল বাতেন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, 'দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে একই কথা বলে যাচ্ছি, কিন্তু কোন কাজ হচ্ছে না। বাবা-মা, ছেলে-মেয়েকে নিয়ে কোন রকমেও দিন পার করতে পারছি না। বাবার যেটুকু জমি পেয়েছিলাম তাও বিক্রি করে দিতে হয়েছে। রোকেয়াকে ভালোবাসি বলে তার স্মৃতিকেন্দ্রকে ছেড়ে কোথাও যেতেও পারি না।' 
 
বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল বলেন, 'আমরা বেগম রোকেয়ার দর্শন ও আদর্শ বাস্তবায়ন করে রোকেয়াকে আমাদের মাঝে বাঁচিয়ে রাখতে পারি। রোকেয়ার শেষ স্মৃতি তার পৈত্রিক ভিটা-বাড়ির ধ্বংসাবশেষ। আর এটি এখনই সংরক্ষণের উদ্যোগ না নিলে দু-তিন বছরের মধ্যেই মুছে যাবে। তাই রোকেয়ার স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার জন্য হলেও সরকারকে এগুলো সংরক্ষণের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।'
 
স্মৃতিকেন্দ্রটির উপ-পরিচালক আব্দুল্যাহ আল ফারুক জানান, কখনও কোন স্কুল নিজের চোখেও দেখেননি বেগম রোকেয়া। তারপরেও তিনি তার যে আদর্শ আমাদের জন্য রেখে গেছেন তা বাস্তবায়ন করলে শুধুমাত্র নারীরাই যে উপকৃত হবে তা নয়, বরং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষ আলোকিত হবে, আদর্শবান হবে। এজন্য রোকেয়া চর্চা এবং তার আদর্শ বাস্তবায়নে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
 
IMG0
 
বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র সূত্রে জানা যায়
১৯৯৭ সালের ২৮ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ৩ কোটি ৭৮ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত করে বাংলা একাডেমী। ২০০১ সালের ১ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩ দশমিক ১৫ একর ভূমির উপর নির্মিত আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত স্মৃতি কেন্দ্রটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন। স্মৃতি কেন্দ্রটিতে রয়েছে ২শ' ৬০ আসন বিশিষ্ট একটি আধুনিক মিলনায়তন, ১শ' আসন বিশিষ্ট একটি সেমিনার কক্ষ, ১০ হাজার পুস্তক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন লাইব্রেরি, ৪ হাজার বিভিন্ন বইপত্র-পত্রিকা, গবেষণা কেন্দ্র, সংগ্রহশালা, ২৫টি সেলাই মেশিনসহ একটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস, বেগম রোকেয়ার ভাস্কর্য ও উপ-পরিচালকসহ কর্মচারীদের আবাসন ব্যবস্থা। উদ্বোধনের ৩ মাসের মাথায় ৪ দলীয় জোট সরকারের আমলে স্মৃতি কেন্দ্রের সকল কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া ২০০৪ সালে সেখানকার উপ-পরিচালকসহ ১৩ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্মৃতি কেন্দ্রটি পরিচালিত হলেও ওই বছরের ৪ অক্টোবর দায়িত্ব নেয় বাংলা একাডেমী। পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সালে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে নিয়ে স্মৃতি কেন্দ্রটির তদারকির দায়িত্ব দেয় শিশু ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট রিটের নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত স্মৃতি কেন্দ্রটি যে অবস্থায় আছে সেভাবে রাখার আদেশ দেয়। কিন্তু  তত্ত্বাবধায়ক সরকার সে আদেশ অমান্য করে ২০০৮ সালের নভেম্বরে স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইএ’র (বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশন) কাছে ৫ বছরের জন্য লিজ প্রদান করে। রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টের আদেশে ২০১২ সালের ১ মে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইএ'র কো-অডিনেটর আব্দুর রাজ্জাক মণ্ডল স্মৃতি কেন্দ্রের উপ-পরিচালক আব্দুল্ল্যাহ আল ফারুকের কাছে হস্তান্তর করেন।
 
ইত্তেফাক/জামান