জর্জিয়ার তিব্লিসি শহরে

আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৯, ২০:০২

রুস্তাভেলি রোডের এক কোণের রেস্তোরাঁর উঠোনে ঝিম মেরে বসে আছি। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। তাই এখানে আশ্রয় নেওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। উঠোনটি ঢাকা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের চালে। একটানা বৃষ্টির ধারা সেই চালে পড়বার সময় যেন সৃষ্টি হয় সেতারের মূর্ছনা। সেই শব্দ আমার মাঝে একটা ঝিমুনি ভাব তৈরি করে। আমি একটা চেয়ার টেনে নিয়ে চালে এসে আটকে পড়া বৃষ্টির ফোঁটা দেখি। আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, আজ সারাদিন নাকি এমনই চলবে। থেমে থেমে বৃষ্টি হবে, সেইসঙ্গে চলবে রবির সঙ্গে লুকোচুরি। আমার আজকের পরিকল্পনা হচ্ছে, সেই লুকোচুরির মাঝেই তিব্লিসি শহরটাকে যতটা সম্ভব দেখে নেওয়া।

এই সড়কের এক রুটির দোকানে প্রাতঃরাশ সেরেছি এই কিছুক্ষণ আগে। ভেতরে বসার জায়গা নেই। পাতলা পলিথিনের ব্যাগে রুটি কিনে বাইরে দাঁড়িয়ে খেতে হয়। উচ্ছিষ্ট খাবার ফেলতে হয় একটু দূরে পথপাশে থাকা ময়লার বাস্কেটে। সেখানে রাজ্যের মাছি ভনভন করে উড়ছে। আমি কিনেছিলাম আচারুলি। নাম শুনে এটিকে আমাদের আচার জাতীয় কিছু ভেবে বসলে কিন্তু বড্ড বোকা বনতে হবে। নয়নাকৃতি পাউরুটির মাঝখানটায় ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে ডিমের কুসুম। রুটি ছিঁড়ে সেই কুসুমে মাখিয়ে খেতে হয়। একটু অসাবধানতায় খেলেই সেই কুসুম হয় প্রপাত ধরণীতল। আচারুলির সঙ্গে আরো একধরনের রুটি কিনলাম। এর নাম কাছাপুরি। এটা কিন্তু নামে যেমন, তেমনি স্বাদেও আমাদের পুরির কাছাকাছি। পার্থক্য এই যে, এই পুরির ভেতরে থাকে পনির। এতসব কিছু চেখে দেখতে গিয়ে খাবারটা হয়ে গেছে বেশ জম্পেশ। তন্দ্রালুতায় আচ্ছন্ন হবার সেটিও একটি কারণ হতে পারে।

বৃষ্টি থেমে যাওয়ায় আরো কিছু মানুষ ফুটপাতে এসে বসা শুরু করেছেন। মাথায় কালো স্কার্ফ পেঁচিয়ে রাখা থুত্থুরে এক বুড়ি এসে বসলেন এইমাত্র। হাতের মুঠিতে কোনোক্রমে সামলে রাখা নাইলনের ব্যাগ থেকে বের করলেন সবুজ হার্বের থোকা। জর্জিয়ায় এই শুকনো হার্ব অনেকেই ব্যবহার করে মসলা হিসেবে। মৃদুস্বরে তিনি গেয়ে যেতে থাকেন হার্বের গুণগান। তবে এই অবেলায় বুড়ির দুর্বল কণ্ঠস্বর পথচলতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে খুব একটা সমর্থ হয় না। আমি তাঁকে ফেলে এগিয়ে যাই লিবার্টি স্কয়ারের দিকে। আমার ডান ধারে সংসদ ভবন। ভবনের সামনে থাকা ফোয়ারাগুলো এই বাদলা দিনেও অনবরত ছুটে চলে। এই সংসদ ভবন আর পরের ভবনের মধ্যে একটি সরু গলি। গলির একেবারে মাথার বাড়িটির দেয়ালে লটকানো কষ্টিপাথরের ফলকটির দিকে হঠাত্ আমার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়। সেখানে লেখা, ‘১৯৫৬ সালের ৯ই মার্চ ঠিক এইখানে শান্তিপ্রিয় তরুণ জনতার মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়।’ ১৯৫৬! তাহলে কি সোভিয়েত শাসনের বিরুদ্ধে তত্কালীন তরুণ জনতার এই প্রতিরোধ-বিপ্লব? এ নিয়ে পরে জানতে গিয়ে পেলাম চমকপ্রদ এক তথ্য। স্তালিন মারা যান ১৯৫৩ সালে। তারপর ক্রুসচেভ এসে শুরু করেন স্তালিনের আদ্যশ্রাদ্ধ। স্তালিনের বিরুদ্ধে মুখ খুলে আগেকার আমলের বেশকিছু অপকর্মের রাশ টেনে ধরেন। ওদিকে তখনো জর্জিয়ায় স্তালিন একজন দেবতা। তারা মনে করে, সোভিয়েত ভূমির সৌভাগ্য, স্তালিনের মতো এমন একজন লৌহমানব পেয়েছিল। তাদের এই আনুগত্য আর মায়ামোহ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ’৫৬ সালে ছাত্রসমাজ রীতিমতো বিদ্রোহ করে বসে। দাবি—ফিরিয়ে আনতে হবে স্তালিন কর্তৃক আরোপিত শাসনব্যবস্থা। তরুণ সমাজ সাধারণত প্রতিবাদ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে। নিপীড়ক, হত্যাকারীর পক্ষে তারা মাঠে নামে, এমন উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। আজকের পটভূমিকায় জর্জিয়ার তত্কালীন ছাত্রসমাজের এই ফুঁসে ওঠার কথা ভাবলে তাই রীতিমতো বিবমিষা পায়।

লিবার্টি স্কয়ারটি হেঁটে পেরনো সম্ভব নয়। বিশাল স্কয়ার। অনবরত গাড়ি ছুটছে। পাতালপথ ধরে ওপারে যাবার জন্যে এগিয়ে যাই। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় দেখি, পাশের দোকানে সারি সারি স্তালিন। পোড়ামাটিতে গড়া তেমন একটি স্তালিন হাতে নেবার পর অনুভব করি, ভেতরে ঢকঢক করছে তরল কিছু একটা। আমার ভ্যাবাচেকা ভাব দেখে দোকানি রহস্য উন্মোচন করে বলেন, ভেতরে ভরা আছে তাজা জর্জিয়ান ওয়াইন। অনেকেই এমন স্তালিন মূর্তি কিনে বাড়িতে রেখে দেয় বহু বছর বাদে কোনো শুভদিন উদ্যাপনের মুহূর্তে ভেতরে রাখা পুরনো ওয়াইন পানের জন্যে। শুধু এমন মূর্তিজাত ওয়াইন-ই নয়, সে দোকানে আছে জর্জিয়ান ওয়াইনের বিশাল সম্ভার। দোকানি আমাকে ‘তামাদা’ ব্র্যান্ডের ওয়াইন কেনার জন্যে সাধাসাধি করে। আমার অবশ্য ওয়াইন নয়, ভালো লেগেছিল ওই আঙুর থেকেই উত্পাদিত ভিন্ন এক তরল। গতরাতে ঠিক এখানকার এক সস্তা শুঁড়িখানায় ঢুঁ মেরেছিলাম সামনে রাখা চকবোর্ডে কিছু মূল্যসীমা দেখে। চা-চা অর্থাত্ কিনা জর্জিয়ান ব্র্যান্ডি বিক্রি হচ্ছে মাত্র তিন লারি দরে। সিঁড়ি বেয়ে বেজমেন্টে যেতে হয়। সেখানে যেয়ে বুঝলাম, এটা একপ্রকার অস্থায়ী পানশালা। চা-চা অর্ডার করার সময়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ভারতীয় ছোকরা কৌতূহলী হয়ে জানতে চায়, ‘আপ ইন্ডিয়ান হ্যায়?’ বাংলাদেশি জানার পর ছেলেটি একপ্রকার চেপে ধরে—ঠিক কোন ভিসায় এলাম জানার জন্যে। মূলত সে জানতে চায়, দালাল ধরে চোরাপথে এসেছি কি না। জর্জিয়ায় বাংলাদেশিদের জন্যে ভিসা অবারিত নয়। সে-সম্পর্কে কথা না বাড়িয়ে আমি ছেলেটির সম্পর্কে জানতে চাই। সাউথ আফ্রিকায় বেশকিছু দিন থাকার পর এক রাতে কৃষ্ণাঙ্গ গ্যাংয়ের কবলে পড়ে বেদম পিটুনি খায় সে। ওদিকে কেরালা থেকে ফেরারি হবার সময়ে করেছে বিস্তর দেনা। সেই দেনা কাঁধে নিয়ে দেশে ফেরা সম্ভব নয়। এখানে ওখানে ভাসতে ভাসতে অবশেষে এসে পৌঁছায় তিব্লিসিতে। এখানে ছোটখাটো ব্যবসা করে। তবে তার কথার আকারে ইঙ্গিতে বুঝি, ওই থাকা আর ব্যবসার কাজটি চালাচ্ছে পুলিশকে দু-চার পয়সা ঘুষ দিয়ে।

এপারের এলাকাটি ট্যুরিস্ট পাড়া। কলকাতায় মির্জা গালিব স্ট্রিটের মতোই এ পাড়া ট্যুরিস্টদের পদভারে মুখর। কাঁধে ব্যাকপ্যাক নিয়ে নানা দেশের লোকেরা খুঁজে চলেছে সস্তা হোস্টেলের ঠিকানা। সেখানে আইকন আঁকার একটি স্কুলের সন্ধান পেয়ে কৌতূহলী হয়ে দাঁড়াই। আমাদের দেশের পটশিল্পীদের মতোই এককালে জর্জিয়ায় আইকন আঁকার কাজটি হতো বংশপরম্পরায়। ঈশ্বরের ছবি আঁকতেন বলে সমাজে ছিল তাঁদের বিশেষ অধিষ্ঠান। কিন্তু কমিউনিস্ট সময়ে চার্চগুলো একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এই পেশার কাজে ভাটা পড়ে। অল্প কিছু শিল্পী ধুঁকে ধুঁকে কাজ চালিয়ে যান। কমিউনিজমের পতনের পর অবশ্য পেশাটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়। নতুন প্রজন্মের অনেকেই পুরনো ওস্তাদদের কাছ থেকে কাজ শেখার জন্যে এগিয়ে আসে। সময় আর প্রজন্ম বদলে গেলেও জর্জিয়ায় আইকন আঁকার ধরনটা কিন্তু একই রয়ে গেছে। মূলত কাঠের প্যানেলের ওপর এগ ট্যাম্পেরা দিয়ে পরিপ্রেক্ষিতবিহীন ভঙ্গিমায় ছবিগুলো আঁকা হয়। ছবিগুলো দ্বিমাত্রিক। এতে আলোর উেসর সন্ধান পাওয়া যায় না। রিয়েলিস্টিক ভঙ্গিমার ধারেকাছেও না যেয়ে আইকনগুলোতে বরং ধরে রাখা হয় বাইজেন্টাইন অঙ্কনকৌশল। স্কুলের নিচতলায় সভাঘরে এঁকে রাখা নানা আইকনের সমাহারে চোখ বুলিয়ে আমার অন্তত তেমন ধারণাই জন্মে। বিশাল জানালার পাল্লা খুলে তার পাশে দিনের ম্রিয়মাণ আলোকে কাজে লাগিয়ে সূক্ষ্ম তুলিতে আইকন আঁকছেন যুবা বয়েসি একজন শিক্ষানবিশ। আমি সেই জানালার মাঝ দিয়ে ল্যান্স গলিয়ে তার একখানা ছবি বাগাই। আঁকার কাজে তন্ময় থাকায় ক্যামেরার ক্লিক তার শ্রবণেন্দ্রিয় অবধি হয়তো পৌঁছায় না।

পুরনো শহরের মাঝ দিয়ে হাঁটছি। দু পাশে পলেস্তরা খসা বাড়ি; গায়ে ছাদের জল নিষ্কাশনের পাইপ। দোতলায় ঝুলে রয়েছে বাহারি কাঠের ঝালরের কাজ করা বারান্দা। হঠাত্ পিসার হেলানো টাওয়ারের মতোই হেলানো একটি স্তম্ভ নজরে আসে। কাছে গিয়ে দেখি, সেটি আদতে ক্লক টাওয়ার। দেখতে অনেক পুরনো মনে হলেও এটি বানানো হয়েছে মাত্র বছর দশেক আগে। এখানকার এক বিখ্যাত পুতুলনাচ শিল্পী নিজের প্রায় পুরো জীবনটিই ব্যয় করেন এই স্তম্ভ গড়ার কাজে। একবার বিশাল ভূমিকম্প হয়েছিল তিব্লিসি শহরে। বহু বাড়িঘর বিধ্বস্ত হলো সেই ভূমিকম্পে। সেই শিল্পী তখন ধ্বংসস্তূপ থেকে কুড়োতে লাগলেন ইট, সুরকি, পাথর। এভাবেই নানা পুরনো জঞ্জাল দিয়ে চল্লিশ বছর লেগে থেকে দাঁড় করিয়ে ফেললেন এই ক্লক টাওয়ার। তবে আমার যেখানে গন্তব্য, সেখানে যেতে হলে তো এই ক্লক টাওয়ারের ঘড়ির কাঁটার দিকে সারাদিন তাকিয়ে থাকলে চলবে না; তাই আমাকে ভিন্নমুখী হয়ে পা চালাতে হয়।

পুরনো শহরের শেষপ্রান্তের একখানা লোহার সিঁড়ি আমাকে টেনে নামায় নিচের সমতলে। ওখানে নেমে দেখতে পাই, পুরো শহরটিই আসলে ঝুলে আছে খাড়া পাথুরে পাহাড়ের গাত্রে। বাড়িগুলোর ঝুলবারান্দা ঠেকনা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা পাথরের খাঁজে। একেকটি কাঠের বাড়ির রং আবার একেকরকম। কোনোটি কমলাবর্ণা, তো কোনোটি মেঘবর্ণা। দু পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা দুটি শান্ত সমাহিত পাহাড়ের মাঝখানটায় প্রপাতের কলতান আমাকে সজাগ করে। সেই জল হয়তো ধীরে ধীরে গিয়ে মিশেছে অদূরের মেতকাভারি নদীতে। আমি জলের রেখা অনুসরণ করে এগুতে গিয়ে খড়ের গাদা আকৃতির কিছু ডোম দেখতে পাই। মাঝ সাগরে খানিক ভেসে থাকা সাবমেরিনের মতোই লালচে ইটের ডোমগুলো মাটির ওপরে জেগে আছে। ডোমের ঠিক মাঝখানটায় চিমনি। এদেরকেই খুঁজছিলাম। যে প্রপাতের জল দেখে এলাম খানিক আগে, সেই জলের ধারা খানিকটা ধরে এনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে এই ডোমের নিম্নদেশে লুকিয়ে থাকা স্নানাগারে। এগুলো সালফার বাথ। এদের উন্মেষ হয়েছিল বহু আগে, জর্জিয়ায় তুর্কিদের শাসনামলে। সালফার-সমৃদ্ধ এই জলে স্নানের ফলে ত্বকের নানা রোগ সারে, সারে বাতের ব্যথাও।

লাইন বেঁধে কয়েকটি স্নানাগারের একটিকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে নির্বাচন করে আমি তাতে ঢুকে পড়ি। কোমরে তোয়ালে পেঁচানো পালোয়ান চেহারার একজন আমাকে দেখে এগিয়ে আসেন। তিনি এই স্নানাগারের ব্যবস্থাপক। স্নানের মূল্য জানিয়ে যোগ করেন—সাবুন নিলে বাড়তি পাঁচ লারি, আর সঙ্গে ইনার বলিষ্ঠ হাতের ম্যাসাজ যোগ করলে গুনতে হবে আরো চল্লিশ লারি। আমি কেবল সাবান আর তোয়ালে নিয়ে কিছুটা ইতস্তত করে ভেতরে ঢুকি। তার আগে অবশ্য মানিব্যাগ আর ক্যামেরা পাশের কামরায় রেখে যেতে হয়। সেসবের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে তিনি চোখ টিপে বলেন, এখানে হিরের থলি রাখলেও কেউ নিয়ে পগারপার হবে না। তুমি নিশ্চিন্ত মনে ভেতরে গিয়ে গতরে সাবুন ডলো।

ভেতরের ঘরটিতে ঢুকেই পাই সালফারের কড়া গন্ধ। সেই গন্ধে ধাতস্থ হতে কিছুটা সময় লাগে। ডানধারে বড় চৌবাচ্চা। কোথায় যেন জল পড়ার টিপটিপ শব্দ। চৌবাচ্চায় ক্রমাগত জল আসছে সেই খাড়ি থেকে, আবার সেই উদ্বৃত্ত জল নিষ্কাসিত হয়ে কোথায় যেন হারিয়েও যাচ্ছে। আমি বাদে ঘরটিতে আর কেউ নেই। থাকলে হয়তো কিছুটা বিব্রত হতে হতো। পুরোপুরি উলঙ্গ হয়ে আর কারো সামনে জলে নামার ব্যাপারটিতে কিছুটা সংকোচ তো কাজ করেই।

আমি চৌবাচ্চার জলে নাক ভাসিয়ে ডুবে যাই। জলের তাপমাত্রা মন্দ নয়। প্রায় ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। প্রাকৃতিকভাবেই এমন তাপমাত্রা। নিশ্চয়ই কোনো উষ্ণ প্রস্রবণ থেকে উত্সারিত হয়ে জলধারার এই এখানে আগমন। ধীরে ধীরে শরীরের ত্বক সেই তাপমাত্রায় নিজেকে মানিয়ে নেয়। আর ভালোলাগার শুরুটা হয় সেখান থেকেই। বহুক্ষণ সেই জলে ভেসে থাকলে মনে হয়, যেন পরিযায়ী পাখির ডানায় ভর করে ভেসে চলেছি বহুদূর মেঘমালার দেশে।

চৌবাচ্চা থেকে উঠে সাবান দিয়ে গা ডলে ঝরঝরে একটা স্নান সেরে বাইরে বেরিয়ে আসি। শরীরে তখনো লেগে আছে সালফারের গন্ধ, আর জলের কুসুম উষ্ণতা। ওদিকে হাম্মামখানার বাইরে তখন সজল হাওয়ার ঝাপটা। শরীরটাকে সেই মুহূর্তে মনে হয় নির্ভার, ফুরফুরে। ওই রেশ থাকতে থাকতেই ঝাউবনের মাঝ দিয়ে বয়ে চলা ইটের রাস্তা ধরে আমি মেতকাভারি নদীর প্রান্তদেশে এসে পৌঁছাই। এখানে আদিগন্ধময় এই শহরের সঙ্গে কিছুটা বেমানান অত্যাধুনিক সেতু। দূর থেকে এটিকে দেখলে মনে হয়, যেন সমুদ্রের ঢেউ। ওই সেতুটির পাশেই আরেকটি ইস্পাত আর কাচনির্মিত বিশাল স্থাপনা। কামানের নলের মতো দৃশ্যমান সেই স্থাপনা নদীর ঢাল বেয়ে নেমে এগিয়ে গেছে জলের দিকে। কথা ছিল, ওখানে শিল্পকলা জাদুঘর হবে। জর্জিয়ার আগেকার প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন ছিল তেমনই। কিন্তু হাল আমলের প্রধানমন্ত্রী সেই পরিকল্পনায় বাদ সেধেছেন। তাঁর কাছে এই নব্য স্থাপনাগুলোর স্থাপত্যকলা জঞ্জালমাত্র; পুরনোর সঙ্গে নতুনের বিসদৃশ মিশেল। তাই ওই ভবনদুটো এই মুহূর্তে জড়ভরত। সেতুটিকে অবশ্য কাজে লাগানো হচ্ছে পথচারী পারাপারের জন্যে। সেতু পেরিয়ে ওপারে গেলে যান্ত্রিক ক্যাবল কার। ক্যাবল কারের বাক্সে চেপে বসলে সেটি খুব ধীরগতিতে নিয়ে পৌঁছায় বহু ওপরের পাহাড়ে থাকা দুর্গে। ভাড়া নামমাত্র। স্থানীয়দের জন্যে ফ্রি। স্কুলফেরত ছেলেমেয়েরা অনেক সময় নিছক মজা করার জন্যেই বাড়ি ফেরার পথে চেপে বসে এই ক্যাবল কারে।

দুর্গ প্রাঙ্গণের এক ডালিম গাছের তলায় দাঁড়ালে নিচের বর্ষাস্নাত নদী, আর নদীতীরের বাড়িগুলোর স্পষ্ট চিত্র ভেসে ওঠে। এই দৃশ্যটির সঙ্গে আমি আগেই পরিচিত। গতকাল সন্ধ্যাবেলায় এখানকার সায়েন্স একাডেমি ভবনের প্রকাণ্ড গথিক থামের আড়ালে লুকানো এক কফিশপে ঢুকেছিলাম। নিয়েছিলাম আনারসের টুকরো ছেঁচে বানানো মোহিতো ড্রিঙ্কস। কফিশপের সামনে কাচের দেয়াল। আমি সড়কমুখী বেঞ্চে বসে সেই দেয়ালের মধ্য দিয়ে দেখি, নিজেদের আঁকা ছবি নিয়ে সামনের বারান্দার কোণের দিকে বসেছেন কয়েকজন অঙ্কনশিল্পী। একটি টুলে দাবার বোর্ড রেখে দুজন মজে গেছেন খেলায়। বাকিরা গোল হয়ে তাদের খেলা দেখছে। ছবিগুলো পড়ে আছে একাকী, খদ্দেরের প্রতীক্ষায়। আমি হাতের ড্রিঙ্কসটি শেষ করে সেই ছবিগুলো দেখতে যাই। গোধূলি বেলার আলোয় স্নাত শহুরে পটভূমিকার একটি ছবি দেখে সেটিকে আরো খুঁটিয়ে দেখার জন্যে দাঁড়িয়ে যাই। নদীর ধারে সুউচ্চ খাড়া পাহাড়। যেন কেউ করাত দিয়ে মসৃণরূপে কেটে দিয়েছে পাহাড়ের গা। সেই পাহাড়ের একেবারে কোণ ঘেঁষে রঙিন বাড়ির সমাহার। ভ্রম হয়, একটু টোকা দিলেই তারা হয়তো হুড়মুড় করে ভেঙে পড়বে নদীর জলে। সেই দৃশ্যটি, আর এখন দুর্গপ্রাঙ্গণ থেকে দেখা দৃশ্য একেবারে এক। শিল্পী তাহলে এখানে বসেই ছবিখানা এঁকেছিলেন। সেই ছবি বা এই দৃশ্যটি কিন্তু মনে আরেক প্রশ্নের উদ্রেক করে। নদীতীরের এই পাহাড়ে ভূমিধস হয় না? তেমন কোনো সম্ভাবনা মাথায় নিয়ে শতকের পর শতক জুড়ে এই বাড়িগুলো টিকে আছে কী করে? পরে জেনেছি এর পেছনকার গুঢ় কারণ। এই পাহাড় পুরোটাই পাথুরে। তাই ধস তো দূরের কথা, প্রবল ভূমিকম্পেও একে কখনো নড়ানো যায়নি। আর তাই অবিকৃতভাবে পাহাড়ের ধারে লটকে থাকা বাড়িগুলোও দিব্যি টিকে আছে মহাকালকে কাঁচকলা দেখিয়ে।

এবারে হেঁটে দুর্গের পেছনদিকটায় যাই। ওপাশটা নির্জন। শহরের ইমারতগুলো এখানে অদৃশ্য। তার বদলে চোখে পড়ে পাহাড়ের অববাহিকায় লেপটে থাকা বোটানিক্যাল গার্ডেন। পার্কটি নিথর, কোলাহলহীন। ওখানে লিন্ডেন আর বার্চ গাছগুলো বর্ষার জল পেয়ে পত্রালি মেলে ধরেছে চারধারে। কোথায় যেন বুলবুল পাখি গান ধরেছে। নির্জন পার্কের নানা বৃক্ষের মাঝে তরঙ্গায়িত হয়ে সেই গানের প্রতিধ্বনি এসে আছড়ে পড়ে এই পাহাড়ে। আমি সেই বুলবুলির কাকলি উত্কর্ণ হয়ে শোনার অভিপ্রায়ে খুব কাছেই পেতে রাখা বেঞ্চে বসি। আর ঠিক তখনই মনে হয়, বরিস পাস্তেরনাক কি এমনই কোনো জর্জিয়ান সকালের সন্ধান পেয়ে লিখে গিয়েছিলেন সেই চরণগুলো—

এখানেই সবকিছু থাকবে; প্রাণবন্ত সবকিছু।

এখানেই আমি প্রাণময়—

আমার স্বপ্ন, ভিত্তিমূল

আর পরাবাস্তব জীবনের মাঝে।