বধ্যভূমির তালিকায় নেই শানাই পুকুর

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ১৪:৩০
 
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বলাহার গ্রামের শানাই পুকুর শুধুই এখন ইতিহাস। হিটলারের নাৎসি বাহিনী যেভাবে ইহুদিদের উপর নির্যাতন চালিয়েছিল সেরকম নির্যাতন '৭১ সালে চালানো হয়েছিল দিনাজপুরবাসীদের ওপর। স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাক বাহিনী ও তার দোসররা শত শত বাঙালিকে হত্যা করে পুঁতে ফেলে শানাই পুকুরের চারটি পাড়ে।
 
'৭১ এর ৯টি মাস পাক বাহিনীর বলাহার ক্যাম্পটি ছিল জল্লাদখানা। দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন মানুষের দুঃখ আর যন্ত্রণার ইতিহাস। বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে আছে গণকবর। স্বজন হারানোর বেদনায় অনেকেই চেয়েছিলেন তাদের হারানো মানুষটির জন্য একটি স্মৃতি স্তম্ভ। সন্দেহমূলকভাবে বাঙালিদের ধরে এনে হত্যা করা হতো এখানে। প্রতিরাতে ভেসে আসতো মৃত্যু যন্ত্রণাকারী মানুষের আর্তনাদ। গুলির শব্দ শুনে আশপাশের গ্রামের মানুষ বুঝতে পারতো কোন বাঙালিকে হত্যা করা হচ্ছে। এ বধ্যভূমি আজও অনেকের অজানা। অসংখ্য শহিদকে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে দিঘিরপাড়ে।
 
শহীদদের রক্তে রঞ্জিত শানাই পুকুরের ৪৬তম বছর অতিক্রান্ত হলে শহিদদের জন্য নির্মিত হয়নি কোন স্মৃতি স্তম্ভ বা বদ্ধভূমি ফলক। এমনও রাত গেছে, এ দিঘিরপাড়ে ৫/৭জনকে পর্যন্ত হত্যা করা হয়েছে। কেবল গুলি করেই নয়, হাত পা বেঁধে এখানে একটি তেঁতুল গাছের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে  খুঁচিয়ে জীবন্ত বস্তাবন্দী করে শানাই পুকুরে ছুড়ে ফেলে হত্যা করা হয়েছে মানুষদের। ১৯৭১ সালে ঘোড়াঘাট উপজেলার সদর ঘোড়াঘাটে পাক বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। এরপর পাঁচবিবি উপজেলার ছাতিনালী গ্রামে অপর একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ঘোড়াঘাট থেকে ছাতিনালী ক্যাম্পে পাক সেনাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য ঘোড়াঘাট উপজেলার কতিপয় মুক্তিসেনা ভারতের হিলি সীমান্ত দিয়ে পার হয়ে এসে রাতের আঁধারে ঘোড়াঘাট হিলি সড়কে তোষাই জোরগাড়ী ও চোরগাছা গ্রামের মাঝখানে একটি ব্রিজে ডিনামাইট বসাই। পরদিন সকালে একটি পাক সেনা অফিসারের জীপ পার হওয়ার সময় ডিনামাইট বিস্ফোরিত হয়। এ ডিনামাইটটি বসিয়ে ছিলেন, সে সময় পালশা গ্রামের রইচ উদ্দিন নামে এক দুর্ধর্ষ ব্যক্তি। রইচ উদ্দিন সে সময় অনেকের নিকট এ কথাটি বলেছিলেন। যেদিন ডিনামাইটটি বিস্ফোরণে ব্রিজ সহ জিপটি উড়ে যাওয়ার সংবাদে পাক হানাদার বাহিনীর মাথায় খুন চেপে যায় এবং সেদিনই প্রায় ৬/৭ হাজার সৈন্যের একটি ক্যাম্প বলাহার হাইস্কুলে স্থাপন করা হয়। হাইস্কুলের পাশেই ছিল একটি দাখিল মাদ্রাসার মাটির ঘর। এই ঘরই তৈরি করা হয় ধরে আনা বাঙালিদের সেল। এ মাটির ঘরের পাশেই শানাই পুকুর। এর পর থেকে শুরু হয় শানাই পুকুরে হত্যা যজ্ঞ। পাক সেনা মেজর মোস্তাক, মেজর আনোয়ার, ক্যাপ্টেন মোজাফ্ফরের নেতৃত্বে এখানে প্রতি রাতে চলত রক্তের হলিখেলা। অথচ এমন একটি পাক হানাদার বাহিনীর হত্যা যজ্ঞ স্থানে স্বাধীনতার ৪৬ বছর পার হতে চললেও কোন স্মৃতি স্তম্ভ বা বধ্যভূমি হিসেবে তালিকায় নাম নেই শানাই পুকুরের।
 
ইত্তেফাক/জামান