রসিক নির্বাচন: যুব সমাজ ও হিন্দুদের ভোট নিয়ে অংক কষছে বড় তিন দল

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০১৭, ২০:৩৯
 
গতবারের ভোটারের সঙ্গে এবার তরুণ-ছাত্র ও যুব সমাজের নতুন ৩৬ হাজার ভোটাসহ হিন্দু সম্প্রদায় ও আটকে পড়া পাকিস্তানিদের ভোটের পেছনে ছুটছেন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি (জাপা) ও বিএনপি মনোনীত মেয়র প্রার্থীরা। এই ভোটসহ নতুন করে যোগ হওয়া রংপুর সিটি কর্পোরেশনের (রসিক) বর্ধিত এলাকার প্রায় ২ লাখ ভোট ভাগ্য নির্ধারণ করবে কে হচ্ছেন আগামী মেয়র। এই ভোটের অংক নিয়ে চলছে নানা দর কষাকষি ও ভোট নেওয়ার কৌশল। 
 
এই কৌশলে আওয়ামী লীগ ও জাপা প্রার্থী এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে পড়েছেন বিএনপি প্রার্থী। এখন পর্যন্ত বিএনপির প্রার্থী নেতাকর্মীদের ঠিকভাবে মাঠে নামাতে পারেনি। বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা মাঠে নামলে আওয়ামী লীগ ও জাপার বিরোধী ভাসমান ভোটগুলো তাদের পক্ষে টানতে পারতেন। কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত বিএনপি প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা নির্বাচন প্রচারণার জন্য আর্থিক তেমন সহযোগিতা না করায় নেতাকর্মীরা নিজেদের উদ্যোগেই তাদের কার্যক্রম সীমিত রেখেছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের একাধিক নেতা জানান, প্রার্থী নির্বাচনে আমাদের ভুল হওয়ায় মহাজোট সরকার বিরোধী ও ভাসমান ভোট আমাদের ঘরে আনতে পারলে মেয়র প্রার্থী নিশ্চিতভাবে জয়লাভ করতে পারত। কিন্তু যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তিনি নেতাকর্মীদের মাঠে নামাতে ব্যর্থ হয়েছেন। জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ কোনো নেতাকে মনোনয়ন দিলে এই সমস্যা হতো না বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নেতা বলেন, মহানগর কমিটির এক শীর্ষ নেতাকে প্রার্থী হওয়ার জন্য দলীয় নেতাকর্মীরা অনুরোধ জানালে তিনি বলেন, আমি দেশের বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচিত মেয়রদের মতো জেলের ভাত খেতে পাবো না। তিনি সব সময় গা বাঁচিয়ে চলেন বলে ক্ষুদ্ধ নেতাকর্মীরা। 
 
জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক রইচ আহমেদ ও জেলা যুবদলের জেলা সভাপতি নাজমুল আলম নাজু মনোনয়ন চাইলেও তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। এই দুই জনের একজনকে মনোনয়ন দিলে রংপুরের যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবকদলসহ অন্যান্য অঙ্গ সংগঠনের হাজার হাজার নেতাকর্মী মাঠ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়াসহ সরকার বিরোধী ভাসমান ভোট, নতুন ভোটার এবং আটকে পড়া পাকিস্তানিদের অধিকাংশ ভোট নিজেদের পক্ষে নিতে পারতেন। 
 
কিন্তু কাওসার জামান বাবলাকে মনোনয়ন দেওয়ায় তিনি এবার গতবারের চেয়েও কম ভোট পাবেন বলে ত্যাগী নেতাকর্মীরা ধারণা করছেন। গত নির্বাচনে বাবলা তার পোস্টার-ব্যানারে কোথাও দলীয় নেতাকর্মীর ছবি পর্যন্ত ব্যবহার না করায় এমনিতেই ত্যাগী নেতাকর্মীরা ক্ষুদ্ধ। তার উপর এবার দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ন্যূনতম টাকা পয়সা খরচ না করায় বিএনপির জেলা কার্যালয় প্রায় প্রতিদিনই নেতাকর্মীদের মধ্যে চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে।
 
এদিকে, দু-একদিনের মধ্যেই বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য রংপুরে আসছেন। অপরদিকে, বিএনপির ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে আহ্বায়ক ও সাংগঠনিক সম্পাদক এবং লালমনিরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি আসাদুল হাবিব দুলুকে সদস্য সচিব করে নির্বাচন পরিচালনায় কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে।
 
মঙ্গলবার দুপুরে নগরীর বেতপট্টি, হাড়িপট্টি এলাকায় গণসংযোগ কালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টু বলেন, অতীতে যত নির্বাচন হয়েছে রংপুরবাসী আমাকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসিয়েছে। আমি তাদের আমানত খেয়ানত করি নাই। তারা পুনরায় আমাকে নির্বাচিত করবেন। জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা নগরীর, মুন্সিপাড়া, ধাপ, কেরানীপাড়া, সেন্ট্রাল রোড় এলাকায় গণসংযোগকালে বলেছেন রংপুরের মানুষ পরিবর্তন চায়। পরিবর্তনের জন্য তারা এবার লাঙ্গল মার্কা বেছে নিবেন। বিএনপির প্রার্থী কাওসার জামান বাবলা রংপুর মঙ্গলবার দুপুরে রংপুর প্রেসক্লাবের সামনে এক পথসভায় বলেছেন, আমার সাথে রংপুরের মানুষ আছে। তারা এবার আমাকে মেয়র নির্বাচিত করবে।
 
অপরদিকে, ৪ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন ও তথ্য গবেষণা সম্পাদক আফজাল হোসেনের নেতৃত্বে ২টি টিম রংপুরে এসে নির্বাচনের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের কথা থাকলেও কেন এখন পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নেতারা রংপুরে আসেনি। নির্বাচনের মাত্র ৮ দিন বাকি থাকলেও নেতারা এখনো রংপুরে এসে না পৌঁছায় সার্বিক প্রচারণা জোরদার হচ্ছে না। কিছু সংখ্যক দলীয় নেতাকর্মী মাঠে কাজ করছেন। এর ফলে ঝন্টু সমর্থকসহ সুধী মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
 
তবে আওয়ামী লীগের ১৭জন মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অধিকাংশকেই এখন মাঠে দেখা যাচ্ছে না। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকল প্রার্থীদের ঢাকায় ডেকে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমেদ ঝন্টুকে মনোনয়ন দিয়ে বাকি মনোনয়ন প্রত্যাশীদের কাজ করার নির্দেশ দেওয়ার ১ মাস অতিবাহিত হলেও হাতে গোনা ৩/৪ জন বাদে বাকিরা নিষ্কিয় রয়েছেন। এর ফলে আওয়ামী লীগের প্রচারণা খুব একটা জোরালো হচ্ছে না। কেন্দ্রীয় নেতারা কেন রংপুরে আসেনি তা জানতে চাইলে বাবু তুষার কান্তি বলেন, তারা শিগগিরই আসবেন।
 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা যে আশা করে বীর মুক্তিযোদ্ধা সরফুদ্দীন আহমদকে মেয়র পদে মনোনয়ন দিয়েছিলেন তা সফল হবে কিনা তা আংশকা করা হচ্ছে। 
ব্যক্তিগত ভোটব্যাংক, দলীয় ইমেজসহ যে সকল দিক ঝন্টুকে অন্যান্য প্রার্থীর থেকে এগিয়ে রেখেছিল তা কাজে লাগাতে পারছে না বলে অভিযোগ করেছেন ঝন্টু সমর্থক সুধী সমাজের অংশ।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি